প্রথমপাতা  

সাম্প্রতিক সংবাদ 

 স্বদেশ

আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশ কমিউনিটি

লাইফ স্টাইল

এক্সক্লুসিভ

বিনোদন

স্বাস্থ্য

বর্তমানের কথামালা

 শিল্প-সাহিত্য

 প্রবাসপঞ্জী 

আর্কাইভ

যোগাযোগ

 

 

 

 

 

 

 

মানবাধিকার কখনো কখনো গৌণ হয়ে উঠতে পারে
 


প্রফেসর আবদুল মান্নান

গত রোববার দপ্তরে অবরুদ্ধ নাটকের ৪৩ দিন পার করলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া । একই সাথে তার নির্দেশে দেশের বিরুদ্ধ চলমান জামায়াত-শিবির ও নিজ দলীয় সন্ত্রাসীদের যুদ্ধের ৪০ দিনও পার হলো । অবরোধের নামে তিনি এই নির্দেশটি দিয়েছিলেন গত ৫ই জানুয়ারী । অজুহাত ছিল সরকার তার ঘোষিত ‘গণতন্ত্র হত্যা’ দিবস পালন করার জন্য তাকে অনুমতি দেয় নি কারণ একই দিন সরকার ‘সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা’ দিবস পালন করার ঘোষণা ইতোপূর্বে দিয়ে রেখেছিল । এই দিন ঠিক এক বছর আগে ১০ম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেই নির্বাচন বেগম জিয়া ও তার মিত্ররা বর্জন করেছিল কারণ তারা চাইছিল একটি অসাংবিধানিক উপায়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক যা বৈধ ভাবে সম্ভব ছিল না । দেশের সংবিধান, আইন আদালত না মানাটা বিএনপি’র বহুদিনের একটি বদ অভ্যাস । ১০ম সংসদ নির্বাচন বর্জন করাটাও তার ব্যতিক্রম ছিল না । একই দিনে রাজধানীতে দেশের দুটি বড় দলকে পরষ্পর বিরোধী কর্মসূচী পালন করতে দিলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পরে, অন্তত আমাদের পূর্বের অভিজ্ঞতা তাই বলে । গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বেগম জিয়া বা তার দলকে সে দিন তাদের কর্মসূচী পালন করতে দিলে তারা সেই কর্মসূচীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না । তাদের একটি সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা ছিল যা ইতোমধ্যে অনেকেই আলোচনা করেছেন । বেগম জিয়া কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় ৫ তারিখ বিকালে সারা দেশে অনির্দিষ্ট কালের জন্য অবরোধের ডাক দেন । তার এই ডাকটি এসেছিল কিছু জামায়াত-জাতীয়তাবাদী ঘরাণার সাংবাদিকদের চাপাচাপিতে । জামায়াত চাইছিল এমন একটি ডাক যদি বিএনপি প্রধান হতে আসে তাহলে তা সহিংসতার মাধ্যমে বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদেও, যার ফলাফল ইতোমধ্যে দেশের মানুষ দেখতে পেয়েছেন ।
এই দফায় জামায়াত-শিবিরের সৃষ্ট সন্ত্রাসের কারণে গত ৪০ দিনে দেশে ৯১ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন যাদের সিংহ ভাগের সাথেই রাজনীতির কোন সম্পর্ক ছিল না । এই সব হতভাগ্যদের মাঝে বাংলাদেশে জামায়াত-শিবিরের উদ্ভাবিত মারণাস্ত্র পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ৫৩ জন । বাকিদের মৃত্যু হয়েছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ ও অন্যান্য কারণে । যারা নিহত বা আহত হয়েছেন তাদের মধ্যে যেমন আছেন আড়াই বছরের শিশু তেমনি আছেন অন্তঃসত্তা মহিলা আর ৭৫ বছরের বৃদ্ধ । এদের অনেকেই নিজের ও পরিবারের পেটের দায়ে ঘর হতে বের হয়েছিলেন । এই সময়ের মধ্যে ১১০০ এর উপর যানবাহন ভাঙচুর করা হয়েছে ১৩ দফায় রেল লাইনের ফিস প্লেট তুলে ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে । যারা এই কাজগুলি করেছে তারা সকলে নাশকতা সৃষ্টিতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত আর তা তারা পেয়েছেন পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরে । শুধু মাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ হয়ে জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কাতরাচ্ছেন ১৩০ জন । একই অবস্থা চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া মেডিকেল কলেজেও । বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিশ্বের নজর কেড়েছিল সেই অর্থনীতি দ্রুত অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে । এটি মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য জামায়াত-বিএনপি একটি দীর্ঘ ও স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । তাদের মূল টার্গেট বাংলাদেশকে পাকিস্তানের পর্যায়ে নিয়ে আসা যেখানে প্রতিদিন মসজীদে বোমা মেরে শত শত মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে আর জঙ্গিদের হাতে স্কুল পড়–য়ারা প্রান দিচ্ছে ।
১৯৭১ সনে বাঙালি যুদ্ধ করে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে দেশটাকে স্বাধীন করেছিল । দেশের আপামর জনগণ দেশের স্বাধীনতা চাইলেও জামায়াত, মুসলীম লীগ, নেজামে ইসলাম সহ আরো কিছু ইসলাম পছন্দ আর পাকিস্তানের ঝান্ডা ধারী দল এই স্বাধীনতা চায় নি এবং তারা পাকিস্তান সেনা বাহিনীর সাথে এক হয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে । দেশ স্বাধীন হলে এরা বেশীরভাগই দেশ হতে পালিয়ে যায় অথবা দেশের চীন পন্থি অতিবিপ্লবী দলগুলির ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেয় । বঙ্গবন্ধু এই সব দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দালাল আইনে তাদের বিচারও শুরু করেন, যা পরবর্তি কালে জিয়া বাতির করেছিলেন । যারা দেশ হতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন তাদের অন্যতম ছিলেন জামায়াতের আমির গোলাম আযম । তিনি প্রথমে পাকিস্তান পরে লন্ডন আর সৌদি আরবে গিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার‘ কমিটি নামে একটি সংস্থা গড়ে তুলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের রাজা বাদশাহদের কাছ হতে কোটি কোটি টাকা তুলে আত্মসাৎ করেন । ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বেগম জিয়ার স্বামী জিয়াউর রহমান প্রথমে যে কাজটি করেন তা হলো একাত্তরে যে ঘাতক দলগুলি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তাদের উপর হতে রাজনীতি না করার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া । এরপর তিনি গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনেন এবং তাকেও অবাধে এই স্বাধীন দেশে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন । এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি চরম লজ্জাজনক অধ্যায়। বাংলাদেশে বর্তমানে যে যুদ্ধ চলছে তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ । এটি গোলাম আযম গংদের অসমাপ্ত যুদ্ধ সমাপ্ত করার জন্য যুদ্ধ । এটি লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তনের সাথে একত্রিকরণের জন্য যুদ্ধ । সেই যুদ্ধে দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বেগম জিয়াকে লন্ডনে পলাতক তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানের কুবুদ্ধি ও কুপরামর্শ দিয়ে সার্বিক সহায়তা করছেন । যদিও বেগম জিয়া আর তার অনুসারিরা বলেন তাদের এই যুদ্ধ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য যুদ্ধ আসলে এই যুদ্ধের আড়ালে স্বল্প মেয়াদী সময়ে জামায়াত-বিএনপি তাদের দুটি উদ্দেশ্য সাধন করতে চাইছে । জামায়াতের মূল উদ্দেশ্য যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাদের যে শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ফাঁসির দন্ড নিয়ে তা কার্যকরের জন্য অপেক্ষা করছে তাদের মুক্ত করা আর বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে দূর্নীতি ও মানি লন্ডারিংএর যে মামলা চলছে তা বানচাল করা । এই মামলায় মা-ছেলের যদি সাজা হয়ে যায় তাহলে তাঁর দু’জনই রাজনীতি হতে অন্ততঃ পাঁচ বছরের জন্য নির্বাসনে যাবেন । যে দিন এই মামলার শুনানি ধার্য করা থাকে ঠিক সেই দিনই বিএনপি একটি হরতাল আহ্বান করে এবং বেগম জিয়া আদালতে যাওয়া হতে বিরত থাকেন । পরবর্তি হরতালটি আগামী ২৫ তারিখ হবে। এমন অবস্থায় অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার কার্য চালিয়ে যাওয়ার বিধান দেশের আইনেই আছে । আদালত ইচ্ছা করলেই সেই আইন কার্যকর করতে পারেন । এই দুটি উদ্দেশ্য যদি জামায়াত-বিএনপি বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলে তাদের আসল দীর্ঘ মেয়াদি উদ্দেশ্য, পাকিস্তানের সাথে একত্রিকরণ বাস্তবায়ন অনেক সহজ হয়ে যাবে ।
বর্তমানে বিএনপি একটি স্বাধীন রাজনৈতিক দল হিসেবে আর কার্যকর নয় । এটি সম্পূর্ণ ভাবে জামায়াতের হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে । দলের অনেক লিভারেল নীতি নির্ধারকরাও জানেন না কী ভাবে দলের এই সব ধ্বংসাত্মক কর্মসূচী নির্ধারিত হয় । কারা বিশ্ব ইজতেমা অথবা ঈদে মিলাদুন্নবীর সময় অবরোধ হরতাল জিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিল তা দলের অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয় । ১৫ লক্ষ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী নির্বিঘেœ নির্ধারিত সময়ে তাদের পরীক্ষা দিতে পারছে না তাতে ক্ষতি কার? নিশ্চয় বিএনপি’র । ১৫ লক্ষ পরীক্ষার্থীর বাড়িতে আনুমানিক ত্রিশ লক্ষ ভোটার আছে । বিএনপি কী ভাবে আশা করে তাঁদের সহানুভূতি পাবে ? আর জামায়াততো নির্বাচনেই অংশ নিতে পারবে না কারণ নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন বাতিল করেছে । এখন সময় হয়েছে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা । এটি দেশের বিদ্যমান আইনেই সম্ভব ।
দেশের জানমাল রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের । তার জন্য দেশে বিভিন্ন ধরণের আইন আছে আর আছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী । কোন একটি সংগঠন বা গোষ্ঠী অথবা দেশ যদি একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তা কঠোর হস্তে দমন করা সেই দেশের সরকারের দায়িত্ব । এখানে মানবাধিকার বিষয়টার গুরুত্ব একেবারেই গৌণ । সব দেশেই এমন ব্যবস্থা বিদ্যমান । সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ডেনমার্কে সন্ত্রাসীদের দমন করতে সেইসব দেশের সরকার ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষকারীর ভূমিকা বিশ্বের সকল মানুষ দেখেছে । কোন আইন আদলতে এই সব সন্ত্রাসীদেও সোপর্দও করা হয় নি । শনাক্ত করা মাত্র হত্যার জন্য গুলি । বাংলাদেশে যে সকল সন্ত্রাসীরা বর্তমানে ক্রিয়াশীল তারা সেই সব দেশের সন্ত্রাসী বা জঙ্গিদের চেয়েও ভয়ঙ্কর । তারা নির্বিচারে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করে ঠিক যেমনটি তারা একাত্তরে করেছিল । শুধু দেখতে হবে যাতে কোন নিরাপরাধ মানুষের মানবাধিকার যেন বিঘিœত না হয় । সরকার যদি এই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তাদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নিতে পারে তা হলে মানুষ বুঝবে দেশে একটি যোগ্য ও শক্তিশালী সরকার আছে যারা জনগনের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে । অগ্নি বোমায় মানুষ মারলে যারা তা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ মনে করেন আর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীর হাতে পেট্রোল বোমা মারা অবস্থায় গুলি বিদ্ধ হয় অথবা মারা যায় তাদের মানবাধিকার হরণ করা হয়েছে বলে যারা চিৎকার করেন এখন সময় হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণের । বাংলাদেশে এই চলমান সহিংসতা পরিচালনার সমুদয় অর্থ যোগান দিচ্ছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই । এখন তা দিবালোকের মতো পরিস্কার । এই প্রসঙ্গে অন্যত্র আলোচনার ইচ্ছা রইলো । তবে এই মুহূর্তে সরকারের জরুরী ভিত্তিতে করণীয় হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তরান্বিত করা, প্রয়োজনে আপিল বিভাগে আলাদা বেঞ্চ গঠন করা; সন্ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগে যাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে তাদের দ্রুত বিচার আইনে বিচার করা; জামায়াত-শিবিরের কার্যক্রম দেশের আইনে নিষিদ্ধ করা আর যারা আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছে তাদেরও আইনের মাধ্যমে কঠোর ভাবে দমন করা । এই সব দ্রুততম সময়ে করা সম্ভব হলে দেশটাকে সাধারণ মানুষের কাছে আবার ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব । না হলে শেষতক দেশটাই হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে । এই দেশ হয়ে উঠতে পারে আর একটি আফগানিস্তান অথবা সিরিয়া যা জামায়াতের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন আর ইদারিং আর সেই স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে বিএনপি ।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় । ফেব্রয়ারি ১৬, ২০১৫

 

 

WARNING: Any unauthorized use or reproduction of 'Community' content is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action. 

 

[প্রথমপাতা]

 

 

 

লেখকের আগের লেখাঃ

[......লেখক আর্কাইভ]