[প্রথমপাতা]

 

 

 

 

 

দেশের সঠিক ইতিহাস না জানলে দেশপ্রেমিক হওয়া কঠিন

 

 

প্রফেসর আবদুল মান্নান

বর্তমান মহাজোট সরকারের শাসনামলে অনেক যুগান্তকারী ভাল ভাল কাজ হয়েছে কিন্তু দু’একটি মন্দ কাজ সব কিছুকে ধুয়ে মুছে নিয়ে গেছে । কাজ যেমন হয়েছে তেমনি ভাবে অনেক ভাল কাজের সিদ্ধান্তও হয়েছে । তবে এটাও সত্য এই অনেক ভাল সিদ্ধান্তের কিছু বাস্তবায়ন হলেও বাস্তবায়নের বাইরে রয়ে গেছে অনেকগুলি । বাস্তবায়ন না হওয়ার অন্যতম কারণ সদ্দিচ্ছার অভাব অথবা যারা এই সিদ্ধান্তগুলি বাস্তবায়ন করবেন তাদের অনীহা । অনেকটা পুরো খেলায় ভাল খেলে শেষ মুহুর্তে গোল খাওয়ার মতো অবস্থা আর কী । এই সবের ফিরিস্তি দিতে হলে লেখার কলেবর বৃদ্ধি পাবে বলে তা অন্য সময় আলোচনা করার ইচ্ছা রইল । এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা সুপারিশের কথা বলি যা বাস্তবায়ন হলে দেশের নতুন প্রজন্ম উপকৃত হবে এবং তাদের জ্ঞানের পরিধিটা কিছুটা হলেও বাড়বে । গত ২১ জুলাই শিক্ষার সব স্তরে আবশ্যিকভাবে ‘জাতীয় ইতিহাস’ নামে একটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি । নিঃসন্দেহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত কারণ অনেক আগে হতেই বাংলাদেশের কয়েকটি প্রজন্ম অনেকটা ইতিহাস বিমুখ হয়ে পরেছে কারণ ইতিহাস যে স্কুল বা কলেজ পর্যায়ে পঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা আমাদের নীতি নির্ধারকরা স্বীকার করতে চান না যার ফলে এখন আর তেমন গুরুত্ব সহকারে স্কুলে বা কলেজ পর্যায়ে ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে আর অন্তর্ভূক্ত থাকে না আর থাকলে তা পড়ানোর জন্য শিক্ষক পাওয়া যায় না । অনেক আগে আমি অন্য একটি জাতীয় দৈনিকে লিখেছিলাম যে প্রজন্ম তার ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে সে জাতি একটি উদ্বাস্তু জাতিতে পরিণত হয় । আবার আর একটি সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশে কিছু তথাকথিত ইংরেজী মাধ্যম স্কুল আছে যারা বিদেশী পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে এবং এর ফলে এই সব স্কুলের পড়–য়ারা ওই সব দেশের ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা জানলেও নিজ দেশের ইতিহাস সম্পর্কে তেমন একটা নয় । একবার তেমন এক ছাত্রের কাছে জানতে চেয়েছিলাম বাংলাদেশের কিছু দর্শনীয় স্থানের নাম বলতে । সে শুরু করলো সিডনি ওপেরা হাউস দিয়ে । আমারতো আক্কেল গুড়–ম । জানতে চাই এমন বিদ্যা সে কোথায় পেল ? তার সহজ উত্তর তার স্কুলের মিস বলেছেন । একাত্তর পরবর্তী প্রজন্মের নিজ দেশের ইতিহাস সম্পর্কে এই ভয়াবহ অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় তাদের দেশপ্রেম সম্পর্কেও সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক । বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সঙ্গবদ্ধ ও পরিকল্পিত সন্ত্রাস সৃষ্টির ক্ষমতা এখন দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত । যারা এই সন্ত্রাস সৃষ্টির পিছনে কাজ করে তাদের বয়স সাধারণত বিশ হতে পঁচিশের মধ্যে । এই বয়সের একজন যুবকতো এই সন্ত্রাস সৃষ্টি করার কথা ছিল না । করে কারণ তার মধ্যে দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে এবং তার অনেকটা সৃষ্টি হয়েছে তার নিজ দেশের ইতিহাস না জানার কারণে অথবা সে যা জানে তাও মারাত্মক ভাবে বিকৃত। তারা যে নিজ দেশের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ তাই নয় বরং যে ইসলামের নামে তারা এইযে সন্ত্রাস আর সংঘাত সৃষ্টি করে সেই ইসলাম সম্পর্কেও তারা তেমন একটা কিছু জানে না । দেশের অগুনতি কওমী মাদ্রাসার কথা বাদই দিলাম সরকারি আলেয়া মাদ্রাসাগুলিতেও ইতিহাস পড়ানো হয় না । আর কোন কোন কওমী মাদ্রাসায় ইতিহাসের নামে পড়ানো হয় একজন বালক কী ভাবে মদ্যপানরত এক রোমান স¤্রাটকে খোলা দরবারে নাঙ্গা তলোয়ার দিয়ে কতল করলো তার কল্প কাহিনী । ওটাই তারা ইতিহাস বলে চালিয়ে দেয় । রোম সাম্রাজ্যের আমলে যে ইসলামের আবির্ভাব হয়নি তা তাদের কে বোঝাবে ?
ইতিহাস বিষয়ে আলোচনা আসলেই অবধারিত ভাবে চলে আসবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিষয়টা । বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ যে দেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে ইতিহাস পরিবর্তন বা তা বিকৃতির মচ্ছব শুরু হয় এবং এই কাজে বিএনপিকে কেউ পরাস্ত করতে পারবে না । বিএনপি যখনই ক্ষমতায় আসে তখন তারা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস শুরু করে তাদের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়ার ২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের সময় হতে । তাদের মতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শুরু জিয়ার ঘোষণার অপেক্ষায় ছিল । তবে তাদের আবার মুক্তিযুদ্ধ কথাটি ব্যবহারে অনীহাও আছে । তার পরিবর্তে তারা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ ব্যবহারে অনেক বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে । এই মর্মে জিয়া তার শাসনামলে সংবিধানও পরিবর্তন করেছিলেন । বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বেগম জিয়ার বিজ্ঞ পরামর্শ দাতা ব্যারিস্টার মউদুদের পরামর্শে কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র হতে জিয়ার ঘোষণার তারিখ পরিবর্তন করে তা ২৬ মার্চ করা হয় কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২৭ নয় ২৬ মার্চ । শুধু দেশের মানুষকে বোকা বানানোর জন্য দিনক্ষণ পরিবর্তন করার এমন ঘটনা বিরল ।
বিংশ শতকের গোড়ার দিক হতে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত জাপান কোরিয়া দখল করে সে দেশের মানুষের উপর চরম নির্যাতন চালিয়েছিল । পরবর্তীকালে জাপানের স্কুলের পাঠ্য বই গুলি হতে জাপানের এই কালো অধ্যায়টা বাদ দেয়া হয় । এর পর শুরু হয় দুই দেশের মধ্যে চরম কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং কোরিয়া ঘোষণা করে জাপান যদি তাদের স্কুলের ইতিহাস বইতে জাপান কর্তৃক কোরিয়া দখলের প্রকৃত ঘটনা গুলি অন্তর্ভুক্ত না করে তা হলে তারা জাপানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য হবে । এতে জাপানের বোধোদয় হয় এবং শুধু যে ওই ইতিহাস পুনরায় পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করে তাই নয় জাপানের একাধিক প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী কোরিয়ার কাছে তাদের অতীত কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং কোরিয়া হতে জাপান যে সকল পুরাকীর্তি পাচার করেছিল সেগুলি ফেরত দেয় । ঠিক উল্টোটা ঘটতে দেখা যায় বাংলাদেশে এবং পাকিস্তানে । বাংলাদেশে একাত্তর সালে পাকিস্তানের এ দেশীয় দোসররা কখনো তাদের ভূমিকার কথা স্বীকার করে না এবং বাংলাদেশের কোন ইতিহাসেই জামায়াতের মতো সংগঠনের সেই সময়কার ভূমিকা সম্পর্কে উল্লেখ করা হয় না । আর কোরিয়ার ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো । ২০০৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রেসিডেন্ট রো মু হীন একটি কমিশন গঠন করেন কোরিয়ায় জাপানের অবস্থানের সময় কারা কারা জাপানকে সহায়তা করেছিল তা খুঁজে বের করার জন্য । দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর কমিশন ২০১০ সালে পাঁচ খন্ডের এক বিশাল প্রতিবেদন পেশ করে । সে প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৬৮ জন দালাল কোরিয় বংশধরদের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় । অন্যদিকে পাকিস্তানের স্কুলে ইতিহাস নামক কোন বিষয়ই পড়ানো হয় না । একবার আমি পাঞ্জাবের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে হল ভর্তি ছাত্রদের সামনে একটি সেমিনার দেয়ার পর জেনে অবাক হলাম বাংলাদেশ আর পাকিস্তান একসময় যে একই দেশ ছিল তা তাদের অনেকেই জানে না । যারা জানে তারাও তা ভুল ভাবে জানে । তাদের শিখানো হয়েছে হিন্দু ভারত ষড়যন্ত্র করে মুসলমান পাকিস্তানের একাংশকে দখল করে তাকে বাংলাদেশ বানিয়েছে ।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকের কার্যপত্র হতে জানা গেছে দেশের ২৬২টি সরকারি কলেজের ১০৮টিতেই ইতিহাস বিষয় নেই । এই সব কলেজে শিক্ষকের সংখ্যাও সাংঘাতিক ভাবে অপ্রতুল । কমিটি কলেজগুলিতে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানোরও সুপারিশ করেছে । এই কমিটি সুপারিশ করতে পারে কিন্তু তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের । এর সাথে জড়িত অর্থ মন্ত্রণালয় । দেশে উদ্বাস্তু প্রজন্মের সংখ্যা যদি আর বাড়াতে না চাই সরকারের উচিৎ হবে স্কুল পর্যায় হতে শুরু করে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত দেশের ইতিহাস সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা । তবে এও খেয়াল রাখতে হবে যেন সেই ইতিহাসে কোন কল্পকাহিনী স্থান না পায় । আমাদের সময়কালে, সেই পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে যদি আমরা ভারত উপমহাদেশের সেই প্রাচীন যুগ হতে আধুনিক যুগের ইতিহাস পড়ার সুযোগ পেয়ে থাকি তাহলে তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে যদি পরবর্তী প্রজন্ম তা হতে বঞ্চিত হয় সেই দায় দায়িত্ব একক ভাবে দেশের সরকারের । স্কুল আর কলেজ পর্যায়ে প্রত্যেকটি বিভাগেই অবস্যই দেশের ইতিহাস পড়ানো বাধ্যতা মূলক করা উচিৎ । এটি একটি ভাল লক্ষণ যে কোন কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ষ্টাডিজ নামের একটি বিষয় পড়ানো হয় তবে দুই একিট ব্যতিক্রম ছাড়া তা সকলের জন্য বধ্যতামূলক নয় । এটি অবস্যই বাধ্যতামলূলক হওয়া প্রয়োজন । নিজ দেশের সঠিক ইতিহাস না জানার কারণে বর্তমান প্রজন্ম কিছুটা শংকর প্রজাতির (মিশ্র প্রজাতি) প্রজন্ম হিসেবে বেড়ে উঠছে । এই প্রজাতির প্রজন্মের কাছে নিখাদ দেশপ্রেম আশা করা অরেণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছুই নয়।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। জুলাই ২৭, ২০১৩

 

 

WARNING: Any unauthorized use or reproduction of 'Community' content is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action. 

 

[প্রথমপাতা]

 

 

 

লেখকের আগের লেখাঃ