[প্রথমপাতা]

 

 

 

 

 

‘দুঃসাহসী’ বাজেটটি বাস্তবায়ন সম্ভব তবে....

 

 

প্রফেসর আবদুল মান্নান

পেশাগত কাজে দিন চারেকের জন্য পাকিস্তানের পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে যেতে হয়েছিল । রাত সাড়ে এগারটার কিছু পরে যখন লাহোরের আল্লামা ইকবাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর হতে বের হই তখন চারিদিকে অন্ধকার । লাহোর, ইসলামাবাদ সহ পাকিস্তানের প্রায় সব শহরে, প্রতিদিন কমপক্ষে গড়ে বার ঘন্টা লোড শেডিং হয় । প্রতি ঘন্টা অন্তর । করাচিতে দিন কয়েক আগে কোন কোন এলাকায় ১৯ ঘন্টা পর্যন্ত লোড শেডিং হয়েছে । পাকিস্তানের বর্তমান বিদ্যুৎ ঘাটতি ৪৫০০ মেগাওয়াট । আমাদের দেশের কিছু পন্ডিত ব্যক্তি আছেন যারা মধ্য রাতের টকশোতে রাজা উজির মারেন এবং সুযোগ পেলেই বলেন আমাদের উচিৎ পাকিস্তানকে অনুসরণ করা । আমার সামর্থ থাকলে তাদের সকলকে পাকিস্তানে এক সপ্তাহের সফরে নিয়ে যেতাম । বিমান বন্দরের বাইরের তাপমাত্রা তখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস । দিনে তা ৪৮ ডিগ্রিতে উঠে । তবে পাকিস্তানে পরিবর্তন আসছে এবং সেই পরিবর্তনের নিয়ামক নতুন প্রজন্ম । তা অন্য সময় বলা যাবে । লাহোর হতে ঢাকায় ফিরে মনে হলো যাক বাবা এ’যাত্রায় বাঁচা গেল । একমাত্র ঢাকার যানজট ছাড়া অন্য সব দিক থেকে আমাদের ঢাকা লাহোরের তুলনায় অনেক বেশী স্বস্তির শহর । দেশে ফিরে দেখি এ’কদিনে বাংলাদেশে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেছে । প্রথমে সরকারের অর্থমন্ত্রী সংসদে বর্তমান সরকারের এই মেয়াদের শেষ বাজেট উপস্থাপন করেছেন । সংসদে বিরোধী দল যোগ দিয়েছে । এই অধিবেশনে তারা যোগ না দিলে তাদের সদস্যপদ খারিজ হয়ে যেত । বিরোধী দল নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য একটি মুলতবি প্রস্তাব দিয়েছিল । এতে অনেকে আশান্বিত হয়েছিল এই বলে হয়তো এখন বিএনপি একটি ক্লাব হতে রাজনৈতিক দলে রূপান্তর হওয়ার পথ ধরেছে । কিন্তু বিধি বাম । জুনের ৩ তারিখ তারা সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়ে সকলকে হতাশ করেছে । প্রধানমন্ত্রী বলেছেন বিএনপি সংলাপ বা এই বিষয়ে সংসদে আলোচনা চায় না সুতরাং সংলাপের পথ তারাই বন্ধ করে দিয়েছে । জাতীয় সংসদে নব নির্বাচিত স্পিকার ডঃ শিরীন শারমিন চৌধুরী তার দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন । রাজশাহীতে বহু প্রতীক্ষিত গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে । একাত্তরের ঘাতক কামরুজ্জামান ট্রাইবুনালে দেয়া তার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । গোলাম আযমের রায় দিতে কেন ট্রাইবুনাল এত দেরী করছে তা নিয়েও অনেকের চিন্তার মাত্রা বেড়েছে । তবে পত্রপত্রিকায় সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে বাজেট নিয়ে আলোচনা সমালোচনা যেটি বাংলাদেশে নতুন নয় । যখন যে সরকারই বাজেট ঘোষণা করেছে তখনই এই ধরণের আলোচনা সমালোচনা হয়েছে । এবার তার মাত্রা একটু বেশী কারণ এই যাত্রায় যে বাজেটটি উপস্থাপন করা হলো তা বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সরকার সর্বসাকুল্যে ছয় মাসেরও কম সময় পাবে। তারপর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এসে যাবে । বাজেট নিয়ে অনেকেই আলোচনা করেন, একদিকে আছে হতাশাগ্রস্ত আর নৈারাশ্যবাদিদের ক্লাব সিপিডি আর টিআইবি । তাদের বক্তব্য শুনলে মনে হবে বাংলাদেশ অতীতে তো অন্ধকারে ছিলই তার ভবিষ্যতও চরম অন্ধকার । জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায় তার সাপ্তাহিক কলামে গত ৬ জুন তাদের একটি জুতসই নামকরণ করেছেন-নন্দলাল । পাকিস্তানের জিও টিভিতে একটি জনপ্রিয় শো ‘আজ কামরান খানকে সাথ,’ যার সঞ্চালক কামরান খান নামের একজন বিশ্লেষক । দেশে ফেরার আগের দিন আমার হোষ্টরা লাহোর গলফ ক্লাবে আমার সম্মানে একটি ডিনারের আয়োজন করেন । সেদিন পাকিস্তানের নব নির্বাচিত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন । ডাইনিং রুমের টিভিতে তখন ওই শো টা চলছিল । বাইরে তখন লোড শেডিং এর ঘন্টা শুরু হয়েছে । প্রয়োজনীয় বাতিগুলি জেনারেটরের সাহায্যে চলছে । আমার প্রটোকল অফিসার বললেন এই উপস্থাপক পাকিস্তানে একজন ক্লাউন হিসেবে পরিচিত কারণ তার কথা শুনলে মনে হবে আজ রাতই পাকিস্তানের শেষ রাত । সিপিডি আর টিআইবি‘র কথাবার্তা শুনলেও অনেকটা তাই মনে হয় । এ’যাবত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষৎ নিয়ে এই দু’টি সংস্থা হতে কদাচিত তেমন কোন ইতিবাচক মন্তব্য শোনা গেছে । দেশের একজন প্রতিথযশা অর্থনীতিবিদ একবার আমাকে বলেছিলেন বহির্বিশ্বে এই দু’টি সংস্থার কারণে বাংলাদেশের সুনামের যে ক্ষতি হয়েছে তা অন্য কোন সংগঠন বা ঘটনা এমন কী বাংলাদেশে এক সময় জঙ্গিবাদের উত্থানও করতে পারে নি । বাজেটের আলোচনা সমালোচনা এই দুটি সংস্থা ছাড়াও অনেক বিশ্লেষক করেছেন । অনেকে বস্তুনিষ্ট থাকার চেষ্টা করেছেন । গণমাধ্যমগুলি তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ হতে বাজেটের বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন । এবার এই আলোচনা সমালোচনায় নতুন সংযোজন চরমোনাই পীর । আল্লামা শফি কেন বাদ গেল তা বোঝা গেল না । বিরোধী দল বাজেট উপস্থাপনের দিন সংসদে অনুপস্থিত ছিলেন । ইতোপূর্বে তারা সংসদের বাইরে বিকল্প বাজেট উপস্থাপন নামের তামাশার আয়োজন করেছিলেন । এবার তারা তা করেন নি । তারা এবারের বাজেটের মৃদু ভাষায় সমালোচনা করেছেন, তবে এই দায়িত্বটা তারা এবার দিয়েছেন ব্যারিস্টার মউদুদকে যিনি আবার দলের ভিতরে ইদানিং নানা কারণে সমালোচিত । বিএনপি এখন তাদের ভবিষৎ নেতা তারেক জিয়া আর তার সহোদর কোকোকে নিয়ে ব্যস্ত ।
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে চুলচেরা বিশ্লষন করার জন্য আমার এই লেখা নয় । তা ইতোমধ্যে চরমোনাইয়ের পীর হতে শুরু করে বিভিন্ন প-িত জনেরা করেছেন । এর মধ্যে আরো হবে । আমার লেখার উদ্দেশ্য দুই একটা প্রাসঙ্গিক বিষয় আলোচনা করা এবং তা করতে গিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটেরও কিছু বিষয় এসে যেতে পারে । বাংলাদেশের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহম্মদ যার মোট পরিমাণ ছিল আট হাজার কোটি টাকা । সেটি ১৯৭২ সালের জুলাই মসের কথা । বাংলাদেশ তখন মুক্তিযুদ্ধের ধ্বংসস্তুপ হতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে । তাজউদ্দিনের উন্নয়নের দর্শন ছিল বিশ্বব্য্যাংক বা আইএমএফএর মতো সমস্যা সৃষ্টিকারী দাতা সংস্থার সাহায্যে না নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করা । বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে ৬৬.৯৫ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত ধরা হয়েছিল । সেই বাজেটে কোন নতুন কর ধার্য করা হতে অর্থমন্ত্রী বিরত ছিলেন । মোট বাজেটের তিনশত সতের কোটি টাকা উন্নয়ন খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল । সে সময় দেশের মানুষের মাথা পিছু আয় ছিল সত্তর ডলার এবং চাহিদার তুলনায় খাদ্য উৎপাদন কম হওয়াতে প্রতি বছর প্রয়োজনের তুলনায় গড়ে এক তৃতীয়াংশ খাদ্য আমদানী করতে হতো । দরিদ্রতম দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নীচে তখন একমাত্র দেশ আফ্রিকা মহাদেশের রুয়ান্ডা । আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পন্ডিতরা তখন বলতেন বাংলাদেশ টিকে থাকলে বিশ্বের যে কোন দেশ ঠিকে থাকবে । চল্লিশ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ এখন অনেকের কাছে একটি বিস্ময় । বিশ্লেষকরা বলেন গণতন্ত্র ও সুশাসন বজায় থাকলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে ২০৫০ সাল নাগাদ অনেক ইউরোপীয় দেশকে ছাড়িয়ে যাবে । অভ্যন্তরীণ উৎস হতে সংগৃহীত আয় ছিল যৎসামান্য কারণ আয়করযোগ্য ব্যক্তি ছিল হাতে গোনা । প্রথম বাজেটের তিনশত পঁচাত্তর কোটি টাকা এসেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপ, বৃটেন, ভারত সহ বাংলাদেশের বন্ধু প্রতিম দেশগুলি হতে এবং এই বৈদেশিক সাহায্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল পণ্য আকারে । চার দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থানের আমূল পরিবর্তন হয়েছে যদিও তা সম্ভাবনার তুলনায় কম এবং এই কম হওয়ার কারণ দেশে বার বার গণতন্ত্র বাধাগ্রস্থ হওয়া এবং অসাংবিধানিক উপায়ে সামরিক স্বৈরশাসকদের ক্ষমতা দখল করা । ১৯৭২ সালের তুলনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন দ্বিগুন হয়েছে । বাংলাদেশ চাইলে এখন খাদ্য রপ্তানি করতে পারে । বিশ্বে চাল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চতুর্থ । যাত্রা শুরু করেছিলাম সত্তর ডলার মাথা পিছু আয় দিয়ে যা বর্তমানে নয়শত তেইশ ডলার । এবার মহাজোট সরকারের শেষ বছরের বাজেটের পরিমাণ আনুমানিক ২.২৫ ট্রিলিয়ন (২,২২,৪৯১ কোটি) টাকা । মহাজোট সরকার তার মেয়াদ শুরু করেছিল ১.৬৭ ট্রিলিয়ন টাকার বাজেট দিয়ে । আশা করা হচ্ছে বর্তমান বাজেটের ৯০ ভাগের বেশী অর্থ আসবে অভ্যন্তরীণ খাত হতে । এটি নিঃসন্দেহে একটি ভাল দিক । আমরা নিজেদের খাদ্য যেমন নিজেরা উৎপাদন করতে পারি নিজেদের বাজেটের অর্থ নিজেরাই যোগান দিতে পারি । তেমনটা যদি হয় তা হলে বিশ্বব্যাংকের মতো বিদেশি দাতা সংস্থার মাতব্বরী অনেকটা কমে যাবে ।
এবারের বাজেটের এই বিশাল আকার দেখে অনেকে চোখ কপালে তুলেছেন । খোদ অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট উত্থাপনের সময় বলেছেন এটি একটি ‘অশোভনীয় আশাবাদের’ বাজেট । সম্ভবত তিনি ইংরেজী ধঁফধপরড়ঁং শব্দটির সহজ সরল বাংলা করেছেন । ভাল হতো যদি তিনি ‘অশোভনীয়’র পরিবর্তে ‘দুঃসাহসী’ শব্দটি ব্যবহার করতেন । হাঁ এবারের বাজেট দুঃসাহসী বাজেট বটে । আবার অনেকেই বলেছেন এটি জনসন্তুষ্টির বাজেট । তাও ঠিক কারণ একটি নির্বাচিত সরকারের কাজই হচ্ছে বাস্তবে জনগণকে সন্তুষ্ট রাখা । কারো কারো মতে এটি নির্বাচনী বাজেট । তাতে কোন অসুবিধা নেই কারণ একটি ক্ষমতাসীন সরকার জনগণের সমর্থন নিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরতে চাইবে । আর জনগণ তখনই একটি দলকে সমর্থন জানাবে যখন তারা সরকারের কাজে কর্মে সন্তুষ্ট থাকবেন । অনেকেই আবার এই বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন দুরুহ হবে বলে মন্তব্য করেছেন । জাতীয় বাজেট হচ্ছে মূলত আগামী এক বছরের একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচী । পরিকল্পনা অথবা কর্মসূচী অনেক ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’র উপর নির্ভরশীল । যেমন অর্থমন্ত্রী যথার্থই গুরুত্ব দিয়েছেন দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর । এই মুহুর্তে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবির যুদ্ধ ঘোষণা করেছে । তাদের দেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ডের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কখনো সম্ভব নয় । জনগণের দাবি দলটিকে নিষিদ্ধ করা । এক অজ্ঞাত কারণে সরকার এই ব্যাপারে একধরণের দোদুল্যমনতায় আছে । দেশের বিনিয়োগের অবস্থা ভাল নয় বলে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন । পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা বলেছেন। কিন্তু কোন পদক্ষেপই যথেষ্ট নয় যদি না দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায় । এটি একটি উদাহরণ মাত্র । তার সাথে আছে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর সুশাসন । শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তি খাতে বেশ মোটা অংকের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে । বর্তমান মন্ত্রী সভায় যে ক’জন সফল মন্ত্রী আছেন তার মধ্যে নিঃসন্দেহে নুরুল ইসলাম নাহিদ একজন । কিন্তু তিনি এই অর্থ ব্যয় করার কৌশল কী ভাবে নির্ধারণ করেন তা দেখার বিষয় । আওয়ামী লীগকে একটি শিক্ষাবান্ধব দল হিসেবে দেখা হয় । কিন্তু এখনো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক স্কুল ঘর আছে যার চালা নেই, শিক্ষার্থীদের বসার জায়গা নেই, পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই । বর্তমান সরকার দেশে অনকগুলি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে । এগুলির অধিকাংশই ভাল চলছে না কারণ ভাল শিক্ষক নেই । মেধাবীরা এখন শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না কারণ প্রথমত তারা মাস শেষে যে বেতন পান তা একজন মুদি দোকানদারও আয় করতে পারেন । বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পৃথক বেতন স্কেল দেয়ার দাবি অনেক পুরানো । এটিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার এখনই সময় । বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে । প্রয়োজন আরো কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপনের । নার্সিং এমন একটি পেশা যেটিতে আজ পাশ করলে কালই বিদেশে মোটা বেতনের চাকুরী পাওয়া যায় । বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের অন্তত একটি নার্সিং স্কুল চালু করার উদ্যোগ নিতে পারেন শিক্ষা বা স্বাস্থ মন্ত্রী । মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির অর্থের অভাব নেই । তারপরও তারা উন্নয়নশীল দেশ কারণ সে সব দেশে কোন উদ্যোক্তা নেই । উদ্যোক্তা হতে হলে প্রয়োজন শিক্ষা, প্রজ্ঞা, ও ঝুঁকি নেয়ার সাহস । এই সবের জন্য সরকারকেই নিয়ামকের ভূমিকা পালন করতে হবে যেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অপরিসীম । এই যে বাংলাদেশের তৈরী পোষাক শিল্প এতদূর এসেছে তাতে সরকারের অবদান নগণ্য । থাকলে এই খাতটি আরো অনেকদূর যেতে পারতো । সরকারি পর্যায়ে এই খাতে যারা কাজ করতে আসে তাদের প্রশিক্ষণের কোন সুযোগ নেই । এই ব্যাপারে বাংলাদেশ শ্রীলংকা হতে শিক্ষা নিতে পারে । সরকারের মধ্যে অনেক ব্যক্তি আছেন যারা তথ্য প্রযুক্তি বলতে শুধু কম্পিউটার টিপাটিপি বুঝেন । এই বুঝার মধ্যে যে কত বোকামি তা যদি তারা বুঝতেন । এনালগ চিন্তাধারার মানুষ দিয়েতো ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয় । বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মহোদয় ভাল ছড়া লেখেন কিন্তু এই খাতে তার অবদান তেমন একটা দৃশ্যমান নয় । এই পরিস্থিতি হতেতো উত্তরণ ঘটাতে হবে ।
কালো টাকা সাদা করা নিয়ে বেশ কথাবার্তা হচ্ছে । এই কথাবার্তা যথার্থ । এতে কোন লাভ হয় না । যারা কালো টাকার মালিক তাদের এই টাকা রাখার জন্য অনেক দেশ তাদের দরজা খুলে দিয়েছে । সাদা করার সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশের এই যাবৎ কোন লাভ হয় নি । কোন দেশই কালো টাকা উপার্জন বন্ধ করতে পারে নি, তবে প্রচলিত আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তা কমাতে পেরেছে । আমাদের এনবিআর একবার দেখতে পারে মাসে অর্ধ লক্ষ বা পৌনে এক লক্ষ টাকা বেতন দিয়ে কাদের সন্তানরা দেশের তথাকথিত বনেদী স্কুলে পরে ? কোথা হতে আসে তাদের বেতনের টাকা ? একবার কানাডা প্রবাসী এক বাঙালি সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন তার প্রতিবেশী বাংলাদেশের এক সরকারি কর্মকর্তার তিন সন্তান, সকলে মোটা বেতন দিয়ে সেখানে পড়ালেখা করে । তাদের স্কুলের হেডমাষ্টার তার বন্ধু । তার কাছে জানতে চেয়েছিল বাংলাদেশের সরকারি চাকুরিজীবীরা কী অনেক বেতন পায়? সে কোন উত্তর দিতে পারে নি । সুতরাং কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে এ যাবৎ দেশের কোন ফায়দা হয় নি আগামীতেও হবে না ।
সব শেষে বলতে হয় কোন বাজেটই ‘অশোভনীয়’ বা ‘দুঃসাহসী‘ নয় যদি তা যারা বাস্তবায়ন করবেন তাদের যোগ্যতা আর প্রশাসনের সক্ষমতা থাকে । মহাজোট সরকারের এই মেয়াদের শেষ বাজেটটা সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে চাই যথাস্থানে যোগ্য লোক । আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা অনেক সহজ কাজকেও কঠিন করে দেয় । এই সব দিকে নজর দিলে চরমোনাই এর পীর আর হতাশাগ্রস্থ আর নৈারশ্যবাদিক্লাব সদস্যদের মুখ বন্ধ করা যাবে । একাত্তরে বাঙালি যখন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল তখনও দেশ স্বাধীন করার বিষয়টি একটি দুঃসাহসী অবিযান মনে হয়েছিল । সেই অভিযানটি বাঙালি সফল করেছিল । সুতরাং সঠিক পদক্ষেপ নিলে একটি দুঃসাহসী বাজেটও বাস্তবায়ন সম্ভব ।

লেখক: সবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় । জুন ১১, ২০১৩

 

 

WARNING: Any unauthorized use or reproduction of 'Community' content is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action. 

 

[প্রথমপাতা]

 

 

 

লেখকের আগের লেখাঃ