|
জোছনা ঝরা রাত-দুপুর
-
মেহেরুন নেছা রুমা
-
মেয়েটি আমার জন্যই গাইতো। এটা ছিল
আমার মনের দাবি। সত্য মিথ্যা যাচাই না করেই তাকে আমি আমার নিজস্ব শিল্পী
বানিয়ে বড় একটা অধিকার নিয়ে শুনে নিতাম তার কণ্ঠের মিষ্টি গান। কখনো বলা হয়ে
ওঠেনি,‘ তুমিতো চমৎকার গাও’। যেদিন বলবার জন্য শুভলগ্ন এসেছিল সেদিন
দুরুদুরু কম্পনে হাজির হই সেই অচেনা অদেখা মেয়েটির কাছে।
প্রতিদিন আমার আসা-যাওয়া সময়ের পথ ধরে, হেমন্তের প্রথম প্রহরে, চিকচিকে
শিশিরভেজা ঘাসের বিছানায় পা রাখতেই আমি শুনতে পেতাম পাখির পালকের মত নরম
ভেজা কণ্ঠের সুরেলা সংগীত। বাহারী গাছগাছালি ঘেরা ছোট্ট বাড়িটির সামনে
ছোট্ট একটি মাঠ। মাঠটি বারো মাসই ঘন সবুজে ঢাকা থাকতো। ইচ্ছা করেই আমি
রাস্তা থেকে একটু নেমে ওই ঘাসের মাঠ দিয়ে পথটুকু পার হতাম। প্রতিদিনের একটা
আকাঙ্খা আর আবদার ভরা মনে প্রকৃতির কাছে ওটাই ছিল আমার দিনের প্রথম দাবি।
মাঠে পা রাখতেই জাদুমন্ত্রের মত বাতাসের পাখায় ভর করে আসা গানের আওয়াজ আমাকে
বিমোহিত করে তুলতো। আমার চলার গতি শ্লথ হয়ে তাতে যুক্ত হতো মৃদুমন্দ ছন্দ।
সেই ছন্দ, শিশির ভেজা ঘাস আর জাদুমন্ত্রের গানে মন আমার দোল খেতো মাঠের কচি
ধানের শিসের মত।
আমি অবশ্য গান ভাল বুঝি না। তবে শুনতে ভাল লাগলে তখনি বলি, বাহ্ চমৎকার
গাওতো তুমি। আমার এই নিজস্ব শিল্পীকে কখনো এই কথাটি বলা হয়নি। হ্যাঁ, হোক
না সে অচনা অদেখা কোন নারী; কৈশোরী, তন্বী কিংবা যুবতী। সেতো আমারি নিজস্ব
শিল্পী। আমারি জন্য সে একই সময়ে গাইতো। অন্তত আমার তাই ধরনা ছিল। হয় যদি তা
মিথ্যে তবুও সে ই আমার গানের পাখি।
কণ্ঠে তার ছিল অদ্ভুত এক মায়া। নইলে আমার মত নিরামিষ প্রকৃতির মানুষকে এমন
আকর্ষণ করে ! কত মানুষই তো ওই পথে যাওয়া-আসা করত। গানের পাখি কি সেই হিসেব
রাখত যে কে তার গান শুনল, কে শুনল না ?
শুনতে শুনতে আমাকে এক ধরনের নেশায় পেয়ে বসল। না শুনলে যেন আমার দিনটাই মাটি
হয়ে যায়। অবশ্য এখন পর্যšত এমন দিন আসেনি যে সে গায়নি আর আমি শুনিনি।
একদিন হলো কি, অনেকক্ষন ধরে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু গানের আওয়াজ আসছে না।
এদিকে স্কুলের সময় হয়ে যাচ্ছে। প্রথম ঘণ্টায়ই নবম শ্রেনীর গণিতের ক্লাসটা
আমাকে নিতে হত। তাই স্কুলে পৌঁছতে হত ঘড়ির কাটায় কাটায়। আমি ভেতরে ভেতরে
অস্থির হয়ে উঠলাম। নিজেকে অপ্রতিরোধ্য মনে হতে লাগল। মন চাইল ওই সবুজ মাঠ
পেরিয়ে, বাহারী বন পেরিয়ে, আমি তার বাড়ির আঙ্গিনায় গিয়ে উঠি। সেই অজানা
মানুষটার সামনে যেয়ে প্রশ্ন করি আজ এখনো কেন তোমার কণ্ঠে সুর বেজে উঠছে না?
আমার সময় যে চলে যাচ্ছে সেই খবর কি তোমার নেই?
সেই খবর সে রাখতে যাবে কেন? তখন বিনয়ের সাথে বললাম, কোথায় তুমি, আমি তো
এসেছি। এবার তবে শুরু করো। মনে হচ্ছিল সে যেন আমারি জন্য গাইবে। আমার ভেতরে
যখন অস্থিরতার ধোঁয়া কুন্ডুলি পাকিয়ে উঠছিল, ঠিক সেই সময়ই সুরের টানে আমি
বিমুগ্ধ হয়ে গেলাম। ভেসে আসল রবীন্দ্রনাথের “তুমি কোন কাননের ফুল গো কোন
গগণের তারা..”আমি প্রশান্ত মনে হেঁটে হেঁটে বিহ্বল চিত্তে সুরের সাথে সুর
মিলিয়ে চললাম।
তার কিছুদির পর একদিন তার গান সত্যি সত্যিই আর শোনা গেল না। আমি সেদিন
অপেক্ষা করতে করতে স্কুল মিস করলাম। সেদিন সেই সময়টাতে তুমুল বৃষ্টি শুরু
হল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকলাম। কিন্তু কার জন্য? দারুন এক অভিমান
জমলো আমার মনের মধ্যে। তাকে বললাম, তুমি দেখতে পাচ্ছ না আমি তোমার গান
শোনার অপেক্ষায় থেকে থেকে বৃষ্টিতে কেমন ভিজে যাচ্ছি? এখন যদি আমার জ্বর
হয়? কে আমাকে সেবা করে সু্স্থ করে তুলবে? আমার ঘরে কে আছে বলো? তুমি ছাড়া
আমার ভূবনেতো আর কেহ নাই।
সে বলল, তুমি আর দাঁড়িয়ে থেক না। চলে যাও তোমার কাজে । আজ আমি গাইব না।
আমার মন ভাল নেই।
তোমার মন ভাল নেই? আমারো যে মন ভাল নেই। তোমার গান শোনা হল না তাই। বলেই
হাতটি ধরলাম বিনয়ের সাথে। লাল কাচের চুড়িগুলো রিনিঝিনি টুনটান শব্দে বেজে
উঠল। লজ্জায় লাল হয়ে গেল কঙ্কনা। ওকে আমি কঙ্কনা বলেই ডাকি। যখনি ডাকি তখনি
কাছে আসে। এসে আমার মনটা ভরে দিয়ে তবেই সে যায়।
সেই দিনটা কী যে খারাপ ছিল আমার! সারা দিন সব কিছু বাদ দিয়ে জানালার কাছে
বসে বসে বৃষ্টি দেখলাম। স্কুলেও গেলাম না। ভেজা কাপড় গায়েই শুকাল। এমন কষ্ট
হচ্ছিল আমার! সারারাত ছটফট করে কাটল। ভোর হবার অপেক্ষা করলাম। তারপর
নির্ধারিত সময়ের আগেই আমি সেই বাড়িটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম এক টুকরো সুরের
মুর্চ্ছনা পাবার আশায়। একটু খানি প্রশান্তি এমন করে কে আমায় দেয়! মিনিটের
পর মিনিট,ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দুপুর হয়ে বিকেল গড়াল। আমি ভুলে গেলাম স্কুলে
যাবার কথা। মনের মধ্যে তুফান চলছে। কঙ্কনা কেন গাইছে না? সেকি আমার উপর
অভিমান করেছে? আমি কি কোন অন্যায় করেছি? আমিতো শুধু তাকে না বলে তার গান
শুনেছি চুরি করে। এই অপরাধের শাস্তি দিচ্ছে আমাকে কঙ্কনা? সেদিনও বৃষ্টিতে
ভিজলাম। তখন সময়টাই এমন ছিল। হুট হাট করে বৃষ্টি এসে পরত কোন পূর্বাাভাস
ছাড়াই ।
তিনদিন কেটে গেল। গানের আওয়াজ আসে না। স্কুল থেকে ফোন আসে, আমি বলি
অসুস্থ্য। এমন মিথ্যা আর কখনো বলিনি। অথচ আমি সে জন্য অনুতপ্ত হচ্ছি না। এর
আগে মিথ্যা বললে আমার দম বন্ধ মত অবস্থা হত। মানসিক ভাবে শান্তি পেতামনা
কিছুতেই।
আর পারছিলাম না আমি । সব কিছু ছেড়ে দিয়ে কোন এক অচেনা কঙ্কনার বাড়ির সামনে
পরে থাকি রাত দিন । চতুর্থ দিন হ্্রদয়ের সমস্ত বাঁধ ভেঙে আমার সমস্ত বোধের
মৃত্যু হতে চাইল। আমি হয়ে গেলাম লাগামহীন ঘোড়া। আমার অবাধ্য মন আর কিছুতেই
মানতে চাইল না। আমি এক পা দু’পা করে সেই ঘরের দরজায়।
কড়া নাড়তেই একজন মাঝবয়সী নারী বেরিয়ে এলেন।
আমি কি বলব বুঝতে পারছি না । আমতা আমতা করে তারপর বললাম, কঙ্কনা ...বলতে
গিয়ে মনে পড়ল,তার কঙ্কনা নামটি তো আমার দেয়া। আসল নামতো আমি জানি না। তাহলে
কী বলব ? এক সময় বললাম, এখানে যে একজন গান গাইতেন...
মহিলার সিঁথিতে যেন প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশীই সিঁদুর দেয়া ছিল। লাল
টুকটুকে একটা প্রশস্ত রাস্তা যেন চলে গেছে দিগন্তের মাঠ পেরিয়ে। মিষ্টি
হেসে বললেন, ওহ্, সুবলাকে খুঁজছেন? ওরা তো চলে গেছে। আপনি তার কে হন?
-আমি? চলে গেছে মানে? আমি মনে মনে বললাম। তারপর একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে
বললাম, কোথায় গেছেন তারা? তারা মানে আর কে? এই কথাটাও আমার মনে মনে বলা।
-সুবলা তার স্বামী-সন্তান সহ ভারত চলে গেছে । ওদের আরো আগেই যাবার কথা ছিল।
শুধু দূর্গা পুজার অপেক্ষায় ছিল। এই দেশে জন্ম। তাই যাবার আগে দেশের মাটিতে
শেষ দূর্গা পুজাটা করে যাবার ইচ্ছা ছিল তার। পুঁজা শেষে তাই চলে গেল।
সুবলা, স্বামী, সন্তান, পুঁজা, ভারত এসব কি শুনলাম আমি? এসব কি সত্যি?
তাহলে আমার কঙ্কনা? আমার সকাল বেলার গানের পাখি? আমি যার গান শুনার জন্য
সকাল হবার আগেই ভোর দেখতে চেয়েছি! সে চলে গেছে বহু দূরে! আর আসবে না?
স্বামী-সন্তান,সুবলা! একি সত্যি? আমার কঙ্কনা? আমার গানের পাখি? আমি কি আর
শুনব না তার মিষ্টি কণ্ঠের গান! সেতো আমারি নিজস্ব শিল্পী ছিল। আমার দিনের
প্রথম আবদার আর অধিকার ছিল তার বাড়ির সামনের সবুজ মাঠ আর তার কণ্ঠের সুরেলা
সংগীত।
কঙ্কনা কি আসলেই সুবলা? নাকি আমার সাথে মজা করছে, অভিমান করছে আমি বৃষ্টিতে
ভিজেছি বলে। আমাকে শাস্তি দিচ্ছে। হ্যাঁ, তাই হবে। কাল ভোরেই আমি এখান দিয়ে
যাবার সময় আমার কঙ্কনার গান শুনব। হ্যাঁ শুনবই। সে সুবলা নয়; কঙ্কনা। আমার
প্রতিদিনের সকাল বেলার পাখি।
এরপরও আমি প্রতিটি দিনই মারিয়ে যেতাম ওই ঘাসের মাঠ, নিজের মত করে শুনে
নিতাম কঙ্কনার সুর। আমাকে বিমোহিত করে দিত সেই সুর। আমি মৃদু গতিতে পথ
চলতাম আমার গন্তব্যের দিকে। আমার অবচেতন মনে জন্ম নিল আমার ভালোবাসার সাত
রং। আমার রংধনু, ভরা পূর্নিমা, সবুজ ধানের ক্ষেত, জোছনা ঝরা রাত দুপুর।
অদেখা অজানা সুবলাই প্রতিদিন আমার কঙ্কনা হয়ে পাসপোর্ট ভিশার বালাই ঠেলে
চুপি চুপি এসে বাস করতো আমার দুনিয়ায়।
সংসার বিরাগী সন্ন্যাসী আমি হলোনা ঘরে ফেরা এই জনমে।
ARNING:
Any unauthorized use or reproduction of 'Community' content
is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to
legal action.
[প্রথমপাতা] |
লেখকের আগের লেখাঃ
|