প্রথমপাতা  

সাম্প্রতিক সংবাদ 

 স্বদেশ

আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশ কমিউনিটি

লাইফ স্টাইল

এক্সক্লুসিভ

বিনোদন

স্বাস্থ্য

বর্তমানের কথামালা

 শিল্প-সাহিত্য

 প্রবাসপঞ্জী 

আর্কাইভ

যোগাযোগ

 

 

 

 

ধারাবাহিক গল্পঃ
হরিদাসের রমজান মাস

 

 

শাশ্বত স্বপন

 

৫ম পর্বঃ পবিত্র আমানত?

["শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান তাকে জানিয়ে গেল,‘ দাদা, আপনাদের কিচ্ছু হবে না। আমরা আপনাদেরকে রক্ষা করব, ইসলামী রাষ্ট্রে আপনারা আমাদের পবিত্র আমানত কিন্তু একটা কথা, আপনার পরিবারের কেউ যেন মুক্তিদের সাথে না যায়।’ দেশ ভাগের সময়ও এ রকম ‘পবিত্র আমানত’ কথাটি হরি শুনে নাই।" ]
 
বেশ কিছু দিন ধরে এলাকার মানুষের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা ভর করছে। ঢাকা শহরের অবস্থা ভাল না। রাতে নাকি গোলাগুলি হয়েছে। অনেক মানুষ মারা গেছে। দেশে সামরিক শাসন জারী হয়েছে। পাকিস্থানী ম্যালেটারীরা দেশ নাকি দখল করবে। দেশ ভাগের আগে পরে হরি হিন্দু-মুসলমানের রায়ট দেখেছে। দেশ ছেড়ে যায়নি। এবার কেন জানি আগের চেয়ে বেশি ভয় করছে। বাজারের দোকানপাট প্রতিদিন খুলে না। কারা যেন মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে। তাকে না জানিয়ে তার পাড়ার জোয়ান ছেলেরাও যোগ দিচ্ছে। পরে তাকে জানানো হচ্ছে। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান তাকে জানিয়ে গেল, ‘দাদা, আপনাদের কিচ্ছু হবে না। আমরা আপনাদেরকে রক্ষা করব, ইসলামী রাষ্ট্রে আপনারা আমাদের পবিত্র আমানত কিন্তু একটা কথা, আপনার পরিবারের কেউ যেন মুক্তিদের সাথে না যায়।’ দেশ ভাগের সময়ও এ রকম ‘পবিত্র আমানত’ কথাটি হরি শুনে নাই।

প্রতিদিন হরি-মোহনের কাছে খুব খারাপ সংবাদ আসতে থাকে। তাদের কাছের আত্নীয়-স্বজনদের পাকিস্তানী ম্যালেটারী-রাজাকাররা মেরে ফেলেছে। এই গ্রামের দু’জন মহিলাকে রাতের আঁধারে কারা যেন ধরে নিয়ে গেছে। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানকে হরি তা জানালে বলে, আওমিলিগের লোকজন এই কাজ করে আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী আর আমাগো ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে। হরি তুমি জান, ঐ দুই মহিলার স্বামী মুক্তিতে যোগ দিছে।

মুক্তি বাহিনীতে হরিদের পরিবারের লোকজনও যোগ দিচ্ছে। হরি শুরুতে বারণ করলেও এখন আর করে না। দিন দিন ভয় তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। পাঁচ-ছয় পুরুষের ভিটা, এত সম্পদ, এত পরিচিত মানুষ জন, তার গ্রাম--এসব ছেড়ে পালাতে হবে, বাইরের লোকই নয়, তার পরিবারের লোকজনও তাকে পালাতে বলছে। বয়স নয়, কি যেন এক আতংক তাকে আজকাল ঘুমাতে দেয় না।

এ পাড়ার প্রতিটি ঘরের লোকজন সারারাত পালা করে পাড়া পাহাড়া দেয়। একদিন রাতে নরেন হরিদাসের উঠানে এসে হাজির। রাস্তা থেকে তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, কোন উত্তর দেয় না। আবার তাকে খারাপ লোকও মনে হয় না। কয়েকজন তাকে জড়িয়ে ধরেছে, মাজারের খাদেম বা অতি ভক্তরা ( কেউ বলে পাগল) যে শত তালি দেওয়া কাপড় পরে, নরেনও সে রকম কাপড় পড়েছে। দাদা বা মোহন ছাড়া সে কারো কাছে পরিচয় দিবে না। হরি সারারাত বিছানায় গড়িয়েছে, একটুও ঘুম হয়নি। নির্ঘুম চোখে বাইরে এসে দেখে এক পাগল মস্তান।

-কি চাই, মস্তান ভাই, ক্ষূধা লেগেছে? এই উনাকে খেতে দাও।
-দাদা, ওদেরকে দূরে সরে যেতে বলেন
--কে তুমি? আমার মাথা ঠিক নেই, তোমাকে চিনতে পারছি না।
--নরেন

হরির মাথায় যেন বাজ পড়ল। গত বছর তাকে যে হুজুর বেশে দেখেছিল, সেই বেশ নেই।
-- তোমরা দূরে যাও। তুমি কি নিজ ধর্মে ফিরে এসেছ?
--দাদা, আমি বহর বাগদাদী মাজারের খাদেম। ধর্মে ফিরে আসার বিধান তো নেই, দাদা।
ব্রিটিশদের সাথে লিয়াজো করে, আইন করে রাজা রামমোহন সতীদাহ বন্ধ করেছে, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ চালু করেছে। আপনারা, আপনাদের পূর্বপুরুষরা চাইলে ধর্মে ফিরে আসার বিধান চালু করতে পারতেন।
--আইন হয়তো করা যেত, হিন্দু সমাজ তা মানতো কি?
--সতীদাহ, বিধাব বিবাহ ঐ সময়ে অধিকাংশ হিন্দুরাই মানতে চায়নি। সতীর স্বর্গে যাওয়া রাজা রাম মোহন বন্ধ করেছে। কত অপবাদ তাদেরকে শুনতে হয়েছে। এখন কিন্তু সতীদাহ হয় না, বিধবা বিবাহ হচ্ছে।
-- নরেন, ধর্মে ফিরে আসার প্রচলন হবে। তুমি আমি হয়তো দেখে যেতে পারব না। তুমি কি কারনে এসেছ?
--দেশের পরিস্থিতি ভাল না। মোহন কোথায়?
-- বর্ডারে পাঠিয়ে দিয়েছি।
--দাদা, আপনিও চলে যান, ওমরের মা কইল, ওমর পাকিস্থানী সৈন্য নিয়ে এ গ্রামে কাল ভোরে কিবা সকালে আসবে। আপনার পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতি দেখলে আপনাদের বাঁচতে দিবে না, আবার আপনারা সবাই উপস্থিত থাকলেও... ওদের বিশ্বাস নেই।এখানকার শান্তি কমিটির চেয়াম্যানকে ওমর হাত করে ফেলেছে। আপনারা স্বেচ্ছায় ওদের জমি লিখে না দিলে কাউকে বাঁচতে দিবে না। পুরো এলাকাটা মাদ্রাসা বানাবে। দেশ স্বাধীন হলে সব পাবেন। চলে যান, দাদা...

পাড়ার লোকজন নরেনের কথা বিশ্বাস না করলেও হরি করেছে। হরি চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল, যা আগে কেউ এরকম কাঁদতে দেখেনি, এমনকি মা-বাবা মরার সময়ও না। গতবারের রমজানে সে ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারলেও এবারের রমজানের শুরুতে তাকে জন্মভিটা ছেড়ে পালাতে হচ্ছে।

চলবে


 

ARNING: Any unauthorized use or reproduction of 'Community' content is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action. 

[প্রথমপাতা]

 

 

 

 

 

লেখকের আগের লেখাঃ