[প্রথমপাতা]

 

 

 

রোহিঙ্গাঃ নিজ দেশে পরবাসী

  

 

- শাশ্বত স্বপন -

                                                       

 

পর্ব-৩

সপ্তম শতাব্দী থেকেই আরবীয় মুসলমানরা আরাকান সংলগ্ন সমুদ্র বন্দর এলাকায বাণিজ্য করত। এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব চীনের ক্যান্টন বন্দর পর্যন্ত নৌ-বাণিজ্য বহর নিয়ে যাতায়াত করতো। চন্দ্র-সূর্য বংশের প্রথম রাজা মহৎইঙ্গচন্দ্র (মতান্তরে মহতৈং চন্দয় ) ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে বৈশালীতে রাজধানী স্থাপন করেন । তাঁর শাসনামলে আরব মুসলিম বণিকগণ ব্যাপক বাণিজ্য ও সীমিত পর্যায়ে ইসলাম প্রচারের সুযোগ পায়। অষ্টম শতাব্দীতে আরাকান থেকে মেঘনা নদীর পূর্বতীরবর্তী বিস্তৃর্ণ ভু-ভাগে আরবীয় বণিকদের ব্যাপক যাতায়াত ছিল।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৪০৪ সালে নরমিখলা নামে এক যুবরাজ আরাকার শাসন করতেন। তিনি দেশীয় এক সামন্তরাজার বোনকে অপহরণ করে রাজধানী রংগেতে নিয়ে আসেন। ১৪০৬ সালে বার্মার রাজা মেংশো আই আরাকান দখল করলে নরমিখলা তৎকালীন বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসে আশ্রয় নেন। তখন ইলিয়াস শাহীর রাজবংশ গৌর থেকে বাংলা শাসন করতেন। গৌরের সুলতান জালালুদ্দীন শাহের সাহায্যে নরমিখলা ১৪৩০ সালে স্বীয় রাজ্য ফিরে পান। নরমিখলা ধর্মান্তরিত হয়ে মুহাম্মদ সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেছিলেন এবং তার রাজ্যে মুসলিম সভাসদ, সৈন্যতে ভরপুর ছিল্। রাজারা বৌদ্ধ নামের সাথে একটি মুসলিম নামও ধারণ করতেন। রাজ্য দখলে রাখা এবং গৌরের সুলতানদের অনুগ্রহ পাবার জন্য তারা মুসলিম নাম ধারণ করেছিলেন, মনে প্রাণে তারা মুসলমান ছিলেন না, তার বংশধররা সে ধারা বজায়ও রাখেনি। ধারণা করা হয়, আরাকান (চট্রগ্রাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম সহ) তথা বার্মাতে এখান থেকেই মুসলমান জাতির সূত্রপাত।

খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীর মধ্যেই আরাকানে মুসলমানদের প্রভাব পরিলক্ষিত হলেও মূলত: ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে নরমিখলার হৃতরাজ্য পুনরূদ্ধারের পর হতে তা ব্যাপক রুপ লাভ করে। নরমিখলা আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে লঙ্গিয়েত থেকে ম্রোহং এ রাজধানী স্থানান্তর করেন এবং বাংলার করদ রাজা হিসেবে শাসন কার্য পরিচালনা করতে থাকেন।

সিংহাসন পুনরুদ্ধার করার পর নরমিখলা চার বছর (১৪৩০-১৪৩৪ খ্রি:) রাজত্ব করেন। এ সময় থেকে আরাকানরাজ নরমিখলা বাংলার সুলতানদের মত তাঁদের মুদ্রার এক পৃষ্ঠায় ফারসি অক্ষরে কালেমা ও মুসলমানি নাম লেখার রীতি চালু করেন। তাঁর পরবর্তী রাজাগণ বাংলার অধীনতা থেকে মুক্ত হয়েও মুদ্রার এক পৃষ্টে ফারসি অক্ষরে কালেমা ও বৌদ্ধ নামের সঙ্গে মুসলমানি নাম ব্যবহার করতেন। ম্রাউক-উ-রাজবংশের রাজাগণ ১৪৩০-১৭৮৫ খ্রি: পর্যন্ত ৩৫৫ বছরকাল আরাকানে রাজত্ব করেন। তাদের মধ্যে ১৮ জন রাজার মুসলমানি নাম পাওয়া যায়।

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ এর প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, মিয়ানমারের ‘রাখাইন ষ্টেট’ নামে পরিচিত বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্ব সীমান্তে অবস্থিত আরাকান রাজ্যটি খ্রিস্টপূর্ব থেকে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মোটামুটিভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। এরমধ্যে ১৪৩০-১৭৮৪ সাল পর্যন্ত এখানে মুসলিম প্রভাবিত শাসন পদ্ধতি চালু ছিল। কিন্তু ১৭৮৫ সালে বর্মীরাজ বোধপায়া (১৭৮২ – ১৮১১ খ্রিঃ) সশস্ত্র আক্রমণের মাধ্যমে আরাকানের শেষ রাজা থামাডাকে পরাজিত ও নিহত করে আরাকানকে বার্মার অন্তর্ভূক্ত করার পর থেকে অদ্যাবধি সেটি একটি প্রদেশ হিসেবে রয়েছে। আরাকানের উত্তরে চীন ও ভারত, দক্ষিণ ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, উত্তর ও পশ্চিমে বাংলাদেশের দক্ষিণপূর্ব সীমান্তবর্তী নাফ নদীর মধ্যসীমা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম। পূর্বে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী ইয়োমা পর্বতমালা। নাফ নদী আরাকান ও বাংলাদেশের মধ্যে সীমান্ত রেখা হিসেবে কাজ করে। বৃটিশ শাসিত আরাকানের আয়তন ছিল ২০,০০০ বর্গ মাইল। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা উত্তর পার্বত্য আরাকান বার্মার চিন প্রদেশে এবং দক্ষিণ আরাকানের কিছু অংশ লোয়ার বার্মার ইরাবতি প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত করায় বর্তমানে এখানকার আয়তন ১৪,২০০ বর্গমাইল। আরাকানে মোট জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ ইসলামের অনুসারী; এদের মধ্যে থাম্ভইক্য, জেরবাদী, কামানচি, রোহিঙ্গা প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এখানকার অধিকাংশ মুসলমান রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। উত্তর আরাকান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দের লেখা থেকে আরো জানা যায়, বাংলার মুসলমান রাজশক্তির সাথে আরাকানের বিরোধ থাকলেও মুসলমান জাতির প্রতি তাঁদের বিদ্বেষ ছিল না। তাই তাঁদের সৈন্যবিভাগের প্রধান সেনাপতি থেকে আরম্ভ করে প্রত্যেক বিশিষ্ট বিভাগের প্রধান কর্মকর্তার পদ পর্যন্ত মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করেছিলেন। তখন আরাকানের জাতীয় পতাকা, মুদ্রা ও পদকে ঈমানের চিহ্ন স্বরুপ কালেমা এবং পৃথিবীর উপর আল্লাহর শাসন কায়েমের অর্থবহনকারী ‘আকিমুদ্দীন’ এর ছাপ থাকতো, রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে ফার্সি গ্রহণ করা হয়েছিল যা ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ আরাকানে বৃটিশ শাসনাধীনে আসার পরও ২২ বছর পর্যন্ত চালু ছিল। আরাকানের রাজ দরবার ছিল মুসলিম অমাত্য, কাজী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। রাজনীতি, সমরনীতি, দরবারের আদব কায়দায় তাই ইসলামি রীতি-পদ্ধতি অনুসৃত হতো। তাছাড়া সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনেও ইসলামি প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। সেখানে যে পর্দা প্রথার প্রচলন শুরু হয়, বলা হয়, তা খাঁটী আরবীয় মুসলমানদের সংশ্রবের ফল।

 

 

 

ARNING: Any unauthorized use or reproduction of 'Community' content is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action. 

[প্রথমপাতা]

 

 

 

 

 

লেখকের আগের লেখাঃ