[প্রথমপাতা]

 

 

 

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৭)

  

- শাশ্বত স্বপন -

 

মুরাদ কখন রুমে ঢুকেছে, খেয়াল করিনি। ওর সাথে অনেকক্ষণ আলাপ করলাম। টেস্টে মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করেছে। টিউশনি বন্ধ রাখতে বললাম। আমার চাকুরি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না বলে, শুধু চাকুরি হয়েছে--এ কথাই বললাম। ও খুশি হয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে আমি এড়িয়ে গেলাম। মুরাদকে বললাম, কাল-পরশু টাকা দিয়ে আসব। হঠাৎ ওর চোখ, মুখ কেমন হয়ে উঠল। মনে হলো, ওর মাথা ব্যথা করছে। আমাকে লুকাবার জন্য তড়িঘড়ি করে চলে গেল। ডাকলাম কিন্তু শুনল না।

সন্ধ্যার পর সিঁদুরকে পড়াতে গেলাম। প্রথমেই অংক করানো শুরু করলাম। ওর টেবিলের উপর তাকাতেই দেখি, যে কবিতাটা দিয়েছিলাম--তা টাঙিয়ে রেখেছে। কবিতা নিয়ে কিছু বলতে ইচ্ছে করল না। কবিতা আমার ভালো লাগে না। প্রাণহীন জড় পদার্থ মনে হয়। আজকাল বাংলাদেশকে কবির দেশ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। শিক্ষিতদের আশি-নব্বই পার্সেন্ট কোন না কোন বিশেষ সময়ে কবিতা লিখে থাকে। ইচ্ছে করলেই ডাল ভাতের মতো কবিতা লেখতে পারে। আর যদি মাসিক, সাপ্তাহিক কোন ম্যাগাজিনে ছাপানো হবে বলে কবিতা চাওয়া হয়, তাহলে যে জীবনে কোন কবিতাও লেখেনি--সেও কবি হয়ে উঠে। একেবারে না পারলেও কবিতা ধার করে নিজের নামে প্রচার করে। আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ে। সে কলেজ বার্ষিকী পত্রিকার সাথে এমনভাবে যুক্ত যে, সে যাই লিখুক--তাই ছাপা হবে। সারা রাত ঘেমেও সে একটা কবিতার ছয় লাইনও লিখতে পারেনি। যা লিখেছে তাও কয়েকটা কবিতা থেকে নকলকৃত। ওর দুঃখ দেখে অবশেষে ওর প্রেমিকার নামে একটা প্রেমের কবিতা লিখে দিলাম। ওতো খুশিতে আটখানা। যেন এরকম একটা কবিতাই সে লিখতে চেয়েছে। ছাপালে কি হবে, মেয়েটি কবিতাও পাত্তা দিল না, তাকেও পাত্তা দিল না। এক বছর পর শুনলাম, সে সত্যি কবি হয়ে গেছে। তাদের প্রকাশনী থেকে সে একটা কবিতার বই বের করেছে। প্রথমেই ছিল আমার লেখা কবিতাটি। কবি সে-ই আর মেয়েটি নাকি বই পেয়ে পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। পরে শুনেছি মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। আর কবিবন্ধু কবিতা ছেড়ে বিদেশ চলে গেছে।

সিঁদুরের অংক করা শেষ। তিনটা অংক করতে দিয়েছিলাম। তিনটাই ভুল। অন্যান্য পড়া ধরতে গিয়ে দেখি, সবই হ-য-ব-র-ল। কিছুই পারছে না। হঠাৎ সে ‘স্যার’ বলেই কেঁদে দিল। কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। সে বলতে চাইছে কিন্তু লজ্জাবশতঃ বলতে পারছে না। ভেবে নিলাম, আজ আর পড়াব না। কোথাও থেকে সে বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে। প্রথম যেদিন ওদের বাসায় ঢুকি তখন ও পড়ার ফাঁকে বলেছিল, আমাকে নাকি চেনা চেনা লাগে। তার উক্তি ছিল এ রকম--
--স্যার, আপনার কোন ভাই আছে?
--হ্যাঁ, আছে।
--কি নাম?
--মুরাদ।
--কি করে?
--এবার বি.এ পরীক্ষা দেবে।
--কোন কলেজ থেকে?
--ঢাকা কলেজ।
--আপনার মতো চেহারা--আমার একটা ভাই আছে--ঢাকা কলেজে পড়ে। নাম পিযুষ। সে আই.এসসি পরীক্ষা দেবে।

আজ সিঁদুরের অবস্থা দেখে প্রথম দিনের কথোপকথন মনে পড়ছে। আজ আমার বিদায়ের ব্যাপারে কিছু বললাম না। সইতে পারবে না হয়ত। ও আমাকে কি যেন বলতে চায়, অথচ বলছে না। আগামীকাল এ সময়ে আসব বলে চলে এলাম আমার রুমে। পরদিন সকালে ডায়েরীসহ আমি ন্যান্সিদের বাসায় যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। দরজা খুলতেই দেখি ড্রাইভার। তার সাথে কথা বলে বুঝলাম, আমি আসার পর অর্থাৎ গতকাল সকাল থেকে এই পর্যস্ত ন্যান্সি খুব গোলমাল করেছে। আজ সকালে উঠে আমাকে দেখতে না পেয়ে জামা-কাপড় পুড়িয়ে ফেলেছে। তাই মিসেস নজরুল এক্ষুণি আমাকে যেতে বলেছেন।
গাড়িতে উঠে ভাবছি। ন্যান্সি সকালবেলা উঠেই আমাকে খুঁজেছে। আমার জন্য চিৎকার করেছে। আমার মাঝে ফ্রান্সিসের কি বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। এ পৃথিবীতে কারো সাথেই কারো সম্পূর্ণ মিল নেই। সদৃশ হতে পারে। ফ্রান্সিসের অবয়ব বাঙালিদের মতো হল কেন? ফ্রান্সিসের মায়ের কি আগে বাঙালী পুরুষের সাথে বিয়ে হয়েছিল? ফ্রান্সিস কি...? হতেও পারে। ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। ন্যান্সি তার মা-বাবাকে সহ্য করতে পারে না। কেন? ঘটনায় কোন বিরোধীতা ছিল। তার মা-বাবা কি এ ব্যাপারে জড়িত? ডাক্তার মামাকে শুধু মানে, তাও মাঝে মাঝে নাকি তার উপরও রেগে উঠে। পাগলের আচার-আচরণ অদ্ভুত--এটা আমি জানি। পাগল আর এ্যাবনরমাল কি এক? মেন্টাল পেসেন্ট বা কি? আমি তো সব কিছুকেই পাগল ভাবতে শুরু করেছি। ডাক্তারের কাছ থেকে জানতে হবে। আগাম চিস্তা-ভাবনা করে লাভ নেই। তবে একটা ব্যাপারে আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, আমি ডাক্তার নই অথচ আমাকে ডাক্তারের চেয়ে বড় ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে কেন?

জীবনে কখনও অভিনয় করিনি। দর্শক হিসেবে নাটকের অভিনয় শুধু উপভোগ করেছি। তবে দৈনন্দিন জীবনে যা করছি--তাওতো নাটক। জীবন নাটক জ্ঞাতে আর অজ্ঞাতে হয়। কিন্তু এই নাটক আমার জ্ঞাতেই আমাকে করতে হবে। পরিচালক ডাঃ রকিব আহসান। অভিনয়ের প্রধান চরিত্র শোভন ও ন্যান্সি। আরো অভিনেতা-অভিনেত্রী, কলা-কুশলীরা আছেন। নায়িকা মেন্টাল পেসেন্ট। নায়ককে তার সর্বক্ষণ সঙ্গী থাকতে হবে। পরিচালকের কথা মতো কাজ করতে হবে। হ্যাঁ, এটা একটা নাটক। এখানে কেউ মরবে কিনা--জানি না। ডাক্তারও জানে না। আমি কোথায় যাচ্ছি, তা কি আমি নিশ্চিতভাবে জানি? হয়তো জানি, হয়তো জানি না। এরপর হয়তো কপালে আরো দুঃখ আছে। আবার এমনও হতে পারে ন্যান্সি ভালো হয়ে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে জীবন সাথী...। এই নাটকের শেষাংশ ডাক্তার লেখেননি। ডাক্তারও নিশ্চিতভাবে জানেন না--নাটকের শেষে কি হবে? অতএব আমার ইচ্ছা পূরণ হতেও পারে। জীবন নাটকে অনেক কিছুই ঘটে যায়--যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। আমার জীবনে ঘটুক এমন কোন ঘটনা। আমাদের এ হতাশাদীপ্ত, জীবন্মৃত জীবনে লটারী না মিললে কোনদিন বড় হতে পারব না--কোনদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। এ পৃথিবীর সবাই বড় হতে চায়--আমিও চাই।

 

 

ARNING: Any unauthorized use or reproduction of 'Community' content is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action. 

[প্রথমপাতা]

 

 

 

 

 

লেখকের আগের লেখাঃ