[প্রথমপাতা]

 

 

 

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৩)

  

- শাশ্বত স্বপন -

 

মনোযোগ সহকারে ডায়েরী পড়া শুরু করলাম। ডাক্তারের দেওয়া ছয় পৃষ্ঠার কাগজটাও পাশাপাশি পড়তে লাগলাম। জন্ম তারিখ ও প্রিয়-অপ্রিয় কিছু জিনিস--যা ন্যান্সি পছন্দ করে। তার প্রিয় ফল আপেল। আমার সাথে মিলে গেছে। মাঝে মাঝে কাঁটাছেঁড়া--এমনভাবে লেখা যা বুঝাও কষ্টকর। দৈনন্দিন কার্যকলাপ-যার বেশির ভাগই ফ্রান্সিসকে নিয়ে লেখা। দুইটা ছবিও পাওয়া গেল। একটাকে ফ্রান্সিসের গায়ের উপর ন্যান্সি হেলান দিয়ে আছে। অন্যটিতে ফ্রান্সিস ন্যান্সিকে চুমো দিচ্ছে। সে বেশ লজ্জা পাচ্ছে। ন্যান্সি সামনের আটটি দাঁত বের করে, চোখ ছোট করে দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে। খুব সুন্দর জুটি। আমি এমন কিছু ভাবলাম--যা অন্তরে ব্যক্ত, মুখে অব্যক্তই রইল। ডাক্তার এর দেওয়া পুরো কাগজ পড়লাম, ভাবলাম। বার বার বিস্মিত হলাম। স্বর্গ নামক স্থানটা বড় আকাংখিত হয়ে উঠল আমার কাছে। ঘুম আসছে না। আল্পনার স্মৃতি ভেসে আসছে। ক্যাসেট চেঞ্জ করলাম। হেমন্তের গান ছাড়লাম। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। ডায়েরীর পাতা ক্রমাগত পড়তে পড়তে ভোর করে ফেললাম। শেষের পাতা পড়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। মনে মনে বললাম, “হে স্রষ্টা, ফ্রান্সিসকে নেওয়ার জন্য হিংস্র যখন হয়েছিলে তখন ন্যান্সিকেও নিয়ে যেতে।’ ছিয়ানব্বই পৃষ্ঠা। সামান্য সামান্য লেখা বলেই শেষ করতে পেরেছি। ভোরের আযান শোনা যাচ্ছে। ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান না-ঊম...।’ কি মধুর আযানের সুর! শুনলে শুনতে ইচ্ছে করে। বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। সেলিম আজ নামাজ পড়ার জন্য উঠবে না। তার শারীরিক অবস্থা চিন্তা করে আমি উঠালাম না।

পুরো ব্যাপারটা আমার কল্পনাতে নিয়ে গেলাম। গল্প দাঁড়াল এ রকম--নজরুল চৌধুরী ও রেহানা ইয়াসমিনের বিয়ে হওয়ার আট বছর পরও তাদের কোন সন্তান হয়নি। বহু সাধনার পর বিয়ের নবম বছরে তারা এ কন্যাকে পায়। ন্যান্সির জন্ম তারিখ ০২.০১.১৯৭৬। জন্ম থেকে সে পার্থিব স্বর্গসুখে বড় হতে লাগল। তার জন্মের পাঁচ বছর পর্যন্ত তাদের আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহীরা ন্যান্সিকে ফুল দিতে দিতে ফুল বাগানের ফুলকুমারী বানিয়েছিল। তার বিছানা ফুলে ফুলে ভরে যেত। ফুলের উপর সে নিদ্রা যেত। ফুলের মূল্য সে কখনও অনুভব করেনি। সাত বছরের পর থেকে ফুলের পরিমাণ কমতে লাগল। তার ব্যক্তিগত বাড়ি-গাড়ি, গ্যারেজ, ফুলবাগান, অডিটোরিয়াম, চাকর-বাকর ইত্যাদি দিয়ে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হলো। পৃথিবীতে এসে সে চৌধুরী ও রেহানার নিঃসন্তান ও বন্ধ্যাত্ব এর অভিশাপ থেকে বাঁচিয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে একটি সন্তান সাধনায়। আজমীর শরীফ থেকে শুরু করে মসজিদ, মাজার, এতিমখানা, কাঙ্গালী ভোজ, যাকাত, দান-খয়রাত ইত্যাদি কোনকিছুই বাদ ছিল না। ন্যান্সি কথা শেখার পর থেকে যা চাইত তার অনেক গুণ বেশি পেত। প্রতিদিনি তার টিচারের সংখ্যা সাবজেক্ট এর চেয়ে বেশি ছিল। টিচারদের গাড়ি করে নিয়ে আসা হত। আবার তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেয়া হত। ন্যান্সির দু’গালে, ঠোঁটে ও কপালে কত লক্ষ আশীর্বাদ স্বরূপ চুমো পড়েছে--তার হিসাব সাধারণ ক্যালকুলেটরে জায়গা হবে না। মাটি কি জিনিস--তা ন্যান্সি বইয়ে পড়েছে কিন্তু স্পষ্ট করে কখনও দেখেনি। জন্ম থেকে তার অসুখ লেগেই থাকত। মাথা ব্যথা, ঠাণ্ডা, জ্বর, সর্দি তার নিত্যদিনের ব্যাপার। পারিবারিক ডাক্তার ছিলেন দু’জন। যাদের একজন সকালে অন্যজন সন্ধ্যার পরে আসত। তাছাড়া রকিব তো তাদের আত্মীয় ডাক্তার। বাসার খরচ, বাগানোর খরচ, পানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি খরচ লেখার জন্য নিচ তলার কোন এক কামড়ায় একজন ম্যানেজার, একজন হিসাবরক্ষক ও আরেকজন রানিং কর্মী থাকত। ঔষদ খাওয়াতে খাওয়াতে রেহানাসহ কাজের বুয়ারাও হাতুড়ে ডাক্তার হয়ে গেছে। অনেক ঔষধের নাম ও কার্যকারিতা তারা বলতে পারবে। ন্যান্সির বয়স যখন আট বছর তখন থেকে বেশির ভাগ সময় সে কাজের বুয়াদের সেবা- যত্ন বড় হতে লাগল। মিসেস চৌধুরী মানে রেহানা বিভিন্ন ক্লাব, সমিতি, থিয়েটার ইত্যাদি নিয়ে থাকতেন। মাসে অন্তত একবার কোন না কোন কাজে দেশের বাইরে যেতেন। আর মিঃ চৌধুরী সকালে বের হলে কখন ফিরবেন--তা তিনি নিজেও জানতেন না। মেয়ের সাথে মুখোমুখি কথার চেয়ে টেলিফোনেই মনে হয় বেশি কথা হত। ন্যান্সিকে কেউ চড় দিয়েছিল একথা তাদের কোন শত্র“ও বলতে পারবে না। জীবনে অসুখ-বিসুখ ছাড়া সে কোন আঘাত পায়নি। গরীবের তথা ভিক্ষুক, অন্ধ, খোঁড়া--এদের কষ্ট সে কখনও বুঝতে পারেনি। অন্ধ, লেংড়ার চাল-চলন দেখে সে হাসত। তার কাছে এরা অন্যরকম কোন জীব মনে হতো। ন্যান্সির মোট ছত্রিশটা নাম। কিন্তু একটু বড় হয়ে সে নূসরাত চৌধুরী (ন্যান্সি) নামটি পছন্দ করে। স্কুলে এই নামই রাখা হয়।

ন্যান্সি যখন ক্লাশ এইটে পড়ত, তখন একই ক্লাশে ফ্রান্সিস নামে জার্মানীর এক ছেলে তাদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হলো। ছেলেটা জার্মানীর হলেও চেহারা বাঙালীদের মতো। তার বাবা জার্মানী। তার বাঙালী মা জার্মানে থাকা অবস্থায় রিগ্যালিও রোজারিওকে বিয়ে করে। তারা জার্মানীতে একই অফিসে কাজ করত। পরে তাদের দুজনকেই বাংলাদেশে অবস্থিত জার্মান কালচারাল সেন্টারে বদলী করা হয়। তাদের থাকার কোয়ার্টার হয় ন্যান্সিদের পাশের এক ভাড়া বাসায়। ন্যান্সিকে গাড়ি দিয়ে স্কুলে নিয়ে যাওয়া হতো। আবার গাড়ি করেই বাসায় নিয়ে আসা হতো। ড্রাইভারকে হাত করে সে গাড়ি চালানো বেশ শিখে ফেলেছে। তার মাও তাকে পরে অবশ্য এ ব্যাপারে সাহায্য করেছিল। ন্যান্সি ছোটবেলা থেকেই বেশ চঞ্চলা ছিল। দৌড়াদৌড়ি করা ছিল তার অভ্যাস। এক রুম থেকে আরেক রুমে গেলেও সে দৌড়ে যাবে। আর কেউ ঘুমালে তাকে জাগিয়ে উঠিয়ে রাগাতে তার ভালো লাগত। কেউ রাগলে সে হাসত। অবশ্য এ অভ্যাসটা আস্তে আস্তে কমে আসে। কেউ তার উপর কর্তৃত্ব দেখালে সে খুবই রেগে যেত। সে কাউকে ভয় পেত না--এমনকি বাড়ির শিক্ষকদেরও না। তবে স্কুলের শিক্ষকরা বেশির ভাগ বিদেশি হওয়ায় তাদের ভয় পেত। সে ক্লাসের ক্যাপটেন ছিল। ছাত্রী হিসেবে সে ছিল খুবই মেধাবী।

 

 

ARNING: Any unauthorized use or reproduction of 'Community' content is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action. 

[প্রথমপাতা]

 

 

 

 

 

লেখকের আগের লেখাঃ