|
|
ভূপেন হাজারিকা: যাযাবর কবি-শিল্পী তিনি
মোমিন মেহেদী
সত্যি তিনি সময়কে ছুঁয়ে
দিয়েছেন বিভিন্নসময়।
তার প্রমাণ পাওয়া যায়
শরৎ বাবু শীর্ষক এই
গানের মধ্যদিয়ে। তিনি
গেয়েছিলেন- খোলা চিঠি
দিলাম তোমার কাছে/
তোমার গফুর মহেষ এখন/
কোথায় কেমন আছে তুমি
জানো না/ হারিয়ে গেছে
কোথায় কখন তোমার আমিনা/
শরৎ বাবু এ চিঠি পাবে
কিনা জানি না আমি/ এ
চিঠি পাবে কিনা জানি
না/ গেল বছর বন্যা হলো
এ বছরে খরা ৰেতে ফসল
ভাসিয়ে নিলো/ মাঠ শুকিয়ে
মরা এক মুঠো ঘাস পায় না
মহেষ দুঃখ ঘোচে না/ তুমি
জানো না শরৎ বাবু এ চিঠি
পাবে কিনা/ জানি না আমি
এ চিঠি পাবে কিনা জানি
না/ বর্গিরা আর দেয় না
হানা/ নেই তো জমিদার/
তবু কেন এদেশ জুড়ে/
নিত্য হাহাকার জেনেছো
দেশ তো স্বাধীন/ আছে ওরা
বেশ তোমার গফুর আমিনা
আর তোমারই মহেষ/ এক মুঠো
ভাত পায় না খেতে গফুর
আমিনা/ তুমি জানো না/
শরৎ বাবু এ চিঠি পাবে
কিনা/ জানি না আমি এ
চিঠি পাবে কিনা জানি
না... ভূপেন হাজারিকার
এই চিঠি শরৎ বাবু না
পেলেও পেয়েছে লৰ- কোটি
বাঙালি। যাদের মনের ঘরে
বৈষম্য আর বিরোধের
বিপরিতের রথযাত্রা উঠে
এসেছিল সচেতনতার সুরে
সুরে। যে কারনে
যুদ্ধাঙ্গনে, সমাধানে
উচ্চারিত হয়েছে শরৎ বাবু
শীর্ষক এই গান। তিনি
কৈশোরকাল থেকেই গান লেখা,
সুর দেওয়া এবং একই সঙ্গে
গাইতে শুরম্ন করেন তিনি।
তাঁর কণ্ঠ ছিল যেমন
দরাজ, তেমনি মানুষের
প্রতি ছিল গভীর দরদ।
সমাজ ও রাজনৈতিক
বিশ্লেষণ নিয়ে লেখা
গানগুলো তাঁকে গীতিকার
হিসেবে বেশি জনপ্রিয় করে।
আমজনতার কথা তুলে ধরায়
তাঁর গানের মধ্যে জনগণ
বারবার নিজেদের খুঁজে
পেত। হিন্দুধর্মের
পবিত্র নদী গঙ্গার কাছে
তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন,
দুই পাড়ের অসংখ্য
নিপীড়িত-নির্যাতিত
মানুষের
নিষ্ফল-নিষ্করুণ
জীবনযাত্রা দেখেও কেন
তার প্রতিক্রিয়া হয় না,
কেন সে শুধুই বয়ে চলে?'
এই যান্ত্রিক যুগে
সহানুভূতি হারিয়ে প্রায়
যন্ত্র হয়ে ওঠা মানুষকে
মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, 'মানুষ
মানুষের জন্য, জীবন
জীবনের জন্য/ একটু
সহানুভূতি কি মানুষ পেতে
পারে না'। এই
মানবিকতাবোধ তাঁকে
ভিন্নমাত্রায় নিয়ে যায়।
পরিচিত করে তোলে
স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে।
বাংলা, হিন্দি ও অসমিয়া
ভাষায় তাঁর এসব গান
শ্রোতাদের হূদয় স্পর্শ
করে যায়, পায় আকাশচুম্বী
জনপ্রিয়তা। এ ছাড়া তিনি
ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক
ভাষায় গান গেয়েছেন।
বিবিসি বাংলার জরিপে
সর্বকালের সবচেয়ে
জনপ্রিয় বাংলা গানের
তালিকায় দ্বিতীয় স্থানটি
দখল করে, 'মানুষ
মানুষের জন্য' গানটি।
ভূপেন হাজারিকার গাওয়া
অজস্র বাংলা গানের মধ্যে
'দোলা হে দোলা', 'সাগর
সঙ্গমে', 'গঙ্গা আমার
মা', 'একটি কুড়ি দুটি
পাতা' ও 'এ শহর
প্রানত্দর', 'আমায় ভুল
বুঝিস না', 'মোর গাঁয়ের
সীমানায়', 'মেঘ থমথম
করে'সহ অসংখ্য গান
মানুষের কণ্ঠে গুঞ্জরিত
হয়। সংগীতশিল্পী ভূপেন
হাজারিকার প্রতিভা ছিল
বহুমাত্রিক। ভূপেন
হাজারিকার গণসংগীত
বিভিন্ন সময়ে মানুষের
মনে উদ্দীপনা জুগিয়েছে
ঠিক এভাবে- দোলা হে দোলা
হে দোলা/ হে দোলা
আঁকা-বাঁকা পথে মোরা/
কাঁধে নিয়ে ছুটে যাই/
রাজা মহারাজাদের দোলা/
ও দোলা আমাদের জীবনের/
ঘামে ভেজা শরীরের
বিনিময়ে পথ চলে দোলা/
হে দোলা হেইয়ানা হেইয়ানা
হেইয়ানা হেইয়া/ দোলার
ভিতরে ঝলমল করে যে/
সুন্দর পোষাকের সাজ/ আর
ফিরে ফিরে দেখি তাই/
ঝিকমিক করে যে মাথায়
রেশমের তাজ/ হায় মোর
ছেলেটির/ উলঙ্গ শরীরে
একটুও জামা নেই খোলা/
দু'চোখে জল এলে মনটাকে
বেঁধে যে/ তবুও বয়ে যায়
দোলা হে দোলা যুগে যুগে
ছুটি মোরা/ কাঁধে নিয়ে
দোলাটি দেহ ভেঙ্গে
ভেঙ্গে পরে হো পরে/ ঘুমে
চোখ ঢুলু ঢুলু রাজা
মহারাজাদের আমাদের ঘাম
ঝরে পড়ে হো পড়ে/ উঁচু ঐ
পাহাড়ে ধীরে ধীরে উঠে
যাই ভালো করে পায়ে পা
মেলা/ হঠাৎ কাঁধের থেকে
পিছলিয়ে যদি পড়ে/ আর
দোলা যাবে নাকো তোলা
রাজা মহারাজার দোলা/ বড়
বড় মানুষের দোলা ও দোলা/
আঁকা-বাঁকা পথে মোরা
কাঁধে নিয়ে ছুটে যাই/
রাজা-মহারাজাদের দোলা
হে দোলা হে দোলা হে দোলা
হে দোলা... মানবতায় দোলা
দেয়া এই গানের মত করেই
মানুষ মানুষের জন্য
উচ্চারণ করেছিলেন
মানবতাবাদি চির তরম্নণ
ভূপেন হাজারিকা। আজ যার
উত্তরসূরী হিসেবে
নিজেদেরকে গর্বিত মনে
হচ্ছে। তরম্নণরাতো সেই
তরম্নণদের-ই উত্তরসূরী
যারা বয়সের ভারে নূয়ে
এলেও মনের দিক থেকে
থেকেছেন বরাবরই
তারম্নণ্যময়ী-তারম্নণ্যজয়ী।
হঠাৎ করেই কিছুদিন আগে
তাকে বক্ষ সংক্রমণের
জন্য কোকিলাবেন
হাসপাতালে ভর্তি করা
হয়েছিল। কয়েকদিন ধরেই
তার অবস্থা ক্রমশ
আশঙ্কাজনক অবস্থায় গিয়ে
পৌঁছেছিল। তার লিভার
দু'টিও অকেজো হয়ে
গিয়েছিল। শেষ পর্যনত্দ
তিনি বিদায় জানালেন তার
প্রিয় সংগীত জগৎকে।
আমাদের আগামী গড়ার
অনন্য মানুষ ভূপেন
হাজারিকার এই চলে
যাওয়ায় আমরা হয়েছি
বেদনাশিক্ত। সেই
বেদনাশিক্ত কন্ঠেই তাঁর
এই গানটি থাকলো
শ্রদ্ধাঞ্জলী হিসেবে-
মানুষ মানুষের জন্য/
জীবন জীবনের জন্য/ একটু
সহানুভূতি কি/ মানুষ
পেতে পারে না ও বন্ধু।/
মানুষ মানুষকে পণ্য করে,/
মানুষ মানুষকে জীবিকা
করে,/ পুরোনো ইতিহাস
ফিরে এলে/ লজ্জা কি তুমি
পাবে না ও বন্ধু।/ বলো
কি তোমার ক্ষতি জীবনের
অথৈ নদী/ পার হয় তোমাকে
ধরে দুর্বল মানুষ যদি।/
মানুষ যদি সে না হয়
মানুষ/ দানব কখনো হয় না
মানুষ/ যদি দানব কখনো
বা হয় মানুষ/ লজ্জা কি
তুমি পাবে না ও বন্ধু...
সংগীতচর্চার পাশাপাশি
একাধারে ছিলেন কবি,
চলচ্চিত্রনির্মাতা ও
সাংবাদিক। তিনি
যুক্তরাষ্ট্রের
কলাম্বিয়া
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
গণযোগাযোগ বিষয়ে পিএইচডি
করেন। অভিনয় করেছেন এক
পাল নামে একটিমাত্র
চলচ্চিত্রে। এ ছবিতে
তাঁর অভিনয় অনেক
চলচ্চিত্রবোদ্ধার হৃদয়
ছুঁয়ে যায়। অসমিয়া
ভাষার চলচ্চিত্র এরা
বাতার সুর (১৯৫৬) দিয়ে
চলচ্চিত্রকার হিসেবে
অভিষেক ঘটে ভূপেন
হাজারিকার। তিনি ১৪টি
চলচ্চিত্র পরিচালনা
করেন। অসমিয়া ভাষায়
শকুন্তলা (১৯৬০),
প্রতিধ্বনি (১৯৬৪) ও
লটিঘটি (১৯৬৭)
চলচ্চিত্রে তিনি একই
সঙ্গে প্রযোজক, পরিচালক,
গীতিকার, সুরকার ও
সংগীতশিল্পী হিসেবে কাজ
করেছেন। জীবন তৃষ্ণা,
জোনাকির আলো, চামেলী
মেমসাহেব, সীমানা
পেরিয়েসহ বিভিন্ন বাংলা
চলচ্চিত্রের গীতিকার,
সুরকার ও গায়ক ছিলেন
তিনি। ১৯৭৫ সালে চামেলী
মেমসাহেব চলচ্চিত্রে
সুরকার ও শিল্পী হিসেবে
ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র
পুরস্কার লাভ করেন।
সংগীত ও চলচ্চিত্রে
অবদানের জন্য ১৯৭৭ সালে
ভারত সরকারের 'পদ্মশ্রী
পুরস্কার', ভারতীয়
চলচ্চিত্রে অবদানের
স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯২
সালে 'দাদাসাহেব ফালকে'
পুরস্কার, ২০০১ সালে
লাভ করেন ভারতের
রাষ্ট্রীয় উপাধি 'পদ্মভূষণ'।
তবে কয়েক বছর আগে
হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক
দল বিজেপিতে যোগ দিয়ে
ভক্তদের কাছে বিতর্কিত
হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
দীর্ঘ ৩৯ বছর ধরে
হাজারিকার সঙ্গী ছিলেন
চলচিত্রকার কল্পনা লাজমি।
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়
তিনি বলেন, 'ভূপেন শুধু
গায়ক ছিলেন না, ছিলেন
একজন মহান
সমাজসংস্কারকও। ভারতের
পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশকে
বিশ্বের কাছে তুলে
ধরেছিলেন তিনি।মোর
গায়ের সীমানার পাহাড়ের
ওপারে/ নিশিথ রাত্রির
প্রতিধ্বনি শুনি/ কান
পেতে শুনি আমি বুঝিতে
না পারি/ চোখ মেলে দেখি
আমি দেখিতে না পারি/
চোখ বুজে ভাবি আমি ধরিতে
না পারি/ হাজার পাহাড়
আমি ডিঙুতে না পারি/ হতে
পারে কোন যুবতীর শোক ভরা
কথা/ হতে পারে কোন
ঠাকুমার রাতের রূপকথা/
হতে পারে কোন কৃষকের
বুক ভরা ব্যাথা/ চেনা
চেনা সুরটিকে কিছুতে না
চিনি/ শেষ হল কোন
যুবতীর শোক ভরা কথা/
শেষ হল কোন ঠাকুমার
রাতের রূপকথা/ শেষ হল
কোন কৃষকের বুক ভরা
ব্যাথা/ চেনা চেনা
সুরটিকে কিছুতে না চিনি/
মোর কাল চুলে সকালের
সোনালী রোদ পড়ে/ চোখের
পাতায় লেগে থাকা কুয়াশা
যায় সরে/ জেগে ওঠা
মানুষের হাজার চিৎকারে/
আকাশ ছোঁয়া অনেক বাঁধার
পাহাড় ভেঙে পড়ে/ মানব
সাগরের কোলাহল শুনি/
নতুন দিনের যেন পদধ্বনি
শুনি...ভূপেন হাজারিকার
এই অনন্য গান আমাদেরকে
আলোর পথযাত্রী হতে
উৎসাহিত করে। পাশাপাশি
তিনি গেয়েছিলেন 'আমি এক
যাযাবর/ পৃথিবী আমাকে
আপন করেছে/ ভুলেছি
নিজের ঘর।' এবার আপন
পৃথিবীকেও ছেড়ে চলে
গেলেন উপমহাদেশের
প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও
সুরকার। ভূপেন হাজারিকা
মানেই মানবতাবাদ আর
মানুষের রঙধনুময় জীবনের
রথযাত্রা। তারম্নণ্যের
জয়গাঁথা কন্ঠশিল্পী
ভূপেন হাজারিকার জন্ম
১৯২৬ সালের ৮
সেপ্টেম্বর, ভারতের
আসাম রাজ্যে। আরেকজন
ভূপেন হাজারিকা আর কখনো
জন্ম নেবে না।' বয়ে চলা
সময়ের হাত ধরে এগিয়ে
যেতে যেতে তিনি তান
ধরেছিলেন- বিসত্দীর্ণ
দুপারের অসংখ্য মানুষের
হাহাকার/ বিসত্দীর্ণ
দুপারের অসংখ্য মানুষের/
হাহাকার শুইের/ নিঃশব্দে
নিরবে ও গঙ্গা তুমি/
গঙ্গা বইছ কেন/
নৈতিকতার স্খলন দেখেও/
মানবতার পতন দেখেও/
নির্লজ্জ অলস ভাবে বইছ
কেন/ সহস্র বরষার
উন্মাদনার মন্ত্র দিয়ে/
লক্ষ জনেরে সবল সংগ্রামী/
আর অগ্রগামী করে তুালনা
কেন/ জ্ঞান বিহীন নিরব
ঘরের/ খাদ্য বিহীন
নাগরিকের/ সহস্র বরষার
উন্মাদনার মন্ত্র দিয়ে/
লক্ষ জনেরে সবল সংগ্রামী/
আর অগ্রগামী করে তোলনা
কেন/ ব্যক্তি যদি
ব্যক্তি কেন্দ্রিক/
সমষ্টি যদি
ব্যক্তিত্বরোহী/ তবে
শিথিল সমাজকে ভাঙ না
কেন/ সহস্র বরষার
উন্মাদনার মন্ত্র দিয়ে/
লক্ষ জনেরে সবল সংগ্রামী/
আর অগ্রগামী করে তোলনা
কেন/ স্রোতস্বিনী কেন
নাহি বও/ তুমি নিশ্চই
জাহ্নবী নও/ তাহলে
প্রেরণ দাও না কেন/
উন্মত্ত ধরার
কুরম্নক্ষেত্রের/শর
শয্যাকে আলিঙ্গন করা/
লক্ষ কোটি ভারত বাসিকে/
জাগালে না কেন... পুরো
এই গানের কোথাও তিনি
শুধুমাত্র বিনোদন বা
আনন্দর কথা বলেননি।
বলেছেন সাহসের কথা,
বলেছেন জীবন জয়ের কথা।
এই কথা বলেছেন বলেই
তরম্নণদের কাছে তিনি হয়ে
আছেন চিরপ্রিয়জন। যার
প্রতিটি গান বলেছে
তারম্নণ্যজয়ের কথা,
তাঁর দিকে ধাবিত হয়েছে
মন আর মনের প্রতিটি
পর্ব। কেননা, তাঁর কাছে
মনে হয়েছে-বিমূর্ত এই
রাত্রি আমার/ মৌনতার
সুতোয় বোনা/ একটি
রঙ্গিন চাদর।/ সেই
চাদরের ভাজে ভাজে/
নি:শ্বাসেরই ছোঁয়া।/ আছে
ভালবাসা, আদর।/ কামনার
গোলাপ রাঙা/ সুন্দর এই
রাত্রিতে/ নীরব মনের
বর্ষা,/ আনে শ্রাবণ,
ভাদর।/ সেই বরষায় ঝড়ো
ঝরে/ নি:শ্বাসেরই ছোঁয়া।/
আছে ভালবাসা, আদর।/ ঝরে
পড়ে ফুলের মত/ মিষ্টি
কথার প্রতিধ্বনি, ছড়ায়
আতর,/ যেন ছড়ায় আতর।/
পরিধিহীন শংকামুখি
নির্মল অধর/ কম্পন কাতর,
কম্পন কাতর।/ নিয়ম
ভাঙ্গার নিয়ম এ যে,/
নিয়ম ভাঙ্গার নিয়ম এ
যে/ থাক না বাধার পাথর।/
কোমল আঘাত, প্রতি-আঘাত,/
কোমল আঘাত, প্রতি-আঘাত,
রাত্রি নিথর কাতর।/
দূরের আর্তনাদের নদীর/
ক্রন্দন কোন ঘাটের/
দূরের আর্তনাদের নদীর/
ক্রন্দন কোন ঘাটের/
ভ্রূক্ষেপ নেই, পেয়েছি
আমি/ আলিঙ্গনের সাগর।/
সেই সাগরের স্রোতেই আছে/
নি:শ্বাসেরই ছোঁয়া,/ আছে
ভালবাসা, আদর...তারম্নণ্যের
প্রতিক ভূপেন হাজারিকা
জীবিতকালেই কিংবদনত্দিতে
পরিণত হয়েছিলেন গানের
আকাশে উড়ে উড়ে। কেননা,
তরম্নণরা তাঁর গানকে
পছন্দই শুধু গ্রহন করতো
না, আটকে নিত জীবনের
সাথে। আসামের রাজধানী
গুয়াহাটির বুকে তার
পূর্ণাবয়ব মূর্তি বসেছে
তার জীবিতকালেই। ভারতীয়
উপ-মহাদেশের জনপ্রিয়
ব্যক্তিত্ব ভূপেন
হাজারিকা একদিকে ছিলেন
অসামান্য গায়ক ও সুরকার,
অন্যদিকে চলচ্চিত্র
পরিচালক। তিনি ছিলেন
একজন কবি এবং সাংবাদিকও।
ভূপেন হাজারিকা আর
দ্বিতীয়বার জন্ম নেবেন
না। তিনি নিছক গায়ক বা
সুরকার ছিলেন না, তিনি
ছিলেন একজন সমাজ
সংস্কারক। তার জন্যই
ভারতের পূর্বাঞ্চল এবং
বাংলাদেশের নাম বিশ্বে
বিশেষ জায়গা পেয়েছে।
দাদাসাহেব ফালকে
পুরস্কার, পদ্মভূষণের
মতো সম্মান পেয়েছেন তিনি।
২০০৯ সালে তাকে অসমরত্ন
হিসেবে ঘোষণা করা
হয়েছিল। তার লোকসংগীতের
সুরে তিনি মুগ্ধ
করেছিলেন শ্রোতাদের।
বাংলা ও অসমীয় ছাড়াও
তিনি বহু ভারতীয় ভাষায়
গান গেয়েছেন। মাত্র ১২
বছর বয়সে ১৯৩৯ সালে তিনি
আসামের দ্বিতীয় ছবি
জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালের
'ইন্দ্রমালতি'তে প্রথম
অভিনয় ও গান গেয়েছিলেন।
তিনি কলম্বিয়া
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
মৌলিক শিক্ষা বিষয়ে
পিএইচডি লাভ করেছিলেন।
তবে পড়াশোনার জগৎ ছেড়ে
তিনি সংগীত নিয়েই মেতে
ছিলেন সারা জীবন।
আসামের আরেক জনপ্রিয়
গায়ক ও সুরকার হেমাঙ্গ
বিশ্বাস ছিলেন তার
গুরম্ন। ভূপেন
হাজারিকার গলায় গলায়
লোকগান এক অন্য মাত্রা
পেয়েছিল। তার গাওয়া বহু
গণসংগীত মুখে মুখে গাওয়া
হয়। তবে 'রুদালি' ছবিতে
গানের জন্য তিনি এশিয়া
প্যাসিফিক আনত্দর্জাতিক
চলচ্চিত্র উৎসবে
শ্রেষ্ঠ সংগীত
পরিচালকের স্বীকৃতি
পেয়েছিলেন। সংগীতের
পাশাপাশি অনেক
চলচ্চিত্র পরিচালনা
করেছেন তিনি। তারই
উদ্যোগে অসমীয়
চলচ্চিত্র ভারতে একটি
বিশেষ আসন করে নিয়েছে।
ভালোবাসার কথা বলতে বলতে
তিনি উচ্চারণ করেছেন-
মোরা যাত্রী একই তরণীর
সহযাত্রী একই তরণীর/ যদি
সংঘাত হয় তবে ধ্বংস হবে
গর্ব মোদের প্রগতির/
প্রভু চোখ মেলে চাও দেখ
স্বর্গ হতে,/ ও মহা
প্রভু, কী শুন্য সাগর,/
এই তরী পৃথিবীর সারা
মানবজাতির,/ তাই ঈশ্বর
গড়ে দিন মিলনের নৌকো/
চোখ কারও কালো কারও নীল
কারও পিঙ্গল,/ তাই তো
দেখি তোমার আমার/ একই
আকাশ একই ধরণী... একই
সাথে তিনি শিল্পী,
সুরকার, গীতিকার,
সাংবাদিক আর সমাজ
সংস্কারক হিসেবে কাজ
করার পাশাপাশি তিনি
ছিলেন যাযাবর কবি। চারণ
কবিতার কথাগুলো উঠে
এসেছে তাঁর অনবদ্য
মানবতাবাদী কন্ঠের অমিয়
ধারায়।
email:
mominmahadi@gmail.com |
|