|
|
কাদের-লিমনের অন্ধকার: র্যাব-পুলিশের আলো
মোমিন মেহেদী
অমানবিক নির্যাতনের শিকার হবার পর কাদেরের জীবন
হাসি থেকে কান্নায় পরিনত হয়েছিল। কাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও
অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র । তার একমাত্র ছোট বোন ইন্দিরা
গান্ধী বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে । সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ-
তে পরছে । বোনের এই অসামান্য সাফল্যের আনন্দকে ভাগাভাগি করে সে ইস্কাটনে
আত্মীয়ের বাসায় যায় । সেখানে কাদেরের মমতাময়ী মা , আদরের ছোট বোন এবং
আত্মীয় স্বজনরা একত্রিত হয়েছিলেন । রাতে একসাথে খাওয়া-দাওয়া শেষে বোনের
মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে , মাকে সালাম করে সে বাসা থেকে বের হয় কাদের । গভীর
রাতে যানবাহন না থাকার কারণে সে হেঁটেই ইস্কাটন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের
দিকে ফিরছিল। কিন্তু সে তখনও জানতো না পথিমধ্যে কতবড় বিপদ তার জন্য ওৎ পেতে
আছে। তার আর হলে যাওয়া হলো না হলে , পড়ল ভক্ষক পুলিশের কবলে । তারপর
যাচ্ছেতাই ভাবে কাদেরের বর্তমানকে টেনে হিচড়ে খিলগাঁও থানা পুলিশ ডাকাতের
সারিতে নিয়ে যাওয়ার আপ্রান চেষ্টা চালিয়েছে। শুধু এখানেই শেষ নয়, পুলিশের
ভাষ্যমতে, খিলগাঁও ফ্লাই ওভারব্রিজের নিচে একদল ডাকাত ডাকাতির প্রসত্দুতি
নিচ্ছিল । তাদেরকে পুলিশ ধাওয়া করলে , পুলিশকে লক্ষ্য করে তারা ককটেল
নিক্ষেপ করে এবং পালিয়ে যেতে চাইলে পুলিশ তাদের পিছু নেয় । পুলিশের গাড়ি
ধাওয়া করছিল ছিনতাইকারীদের গাড়ীকে। ছিনতাইকারীরা যখন গাড়ী থেকে পালিয়ে
যাচ্ছিল তাদের একজন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এবং তাকে প্রহার করলে সে কাদেরকে
দেখিয়ে তাদের সহকারী বলে দাবী করে। তখন তারা ওই ছিনতাইকারীর বক্তব্যের
ভিত্তিতে কাদের কে আটক করে। কাদের তখন তাদের বলে, "আমি যদি তার সহকারী হই,
তাহলে তাকে আমার নাম বলতে বলেন।" এর উত্তর ওই ছিনতাইকারী দিতে পারেনি। এরপর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরিচয় দেয়ার পর সে আরো রোষানলের স্বীকার হয়।
তাকে থানায় নিয়ে বেধড়ক মারা হয়। নির্যাতনে সারা পিঠে বেত্রাঘাতের দাগ ,
তার হাতের আঙুল ফেটে গেছে , বাম পায়ের চামড়া খুলে মাংশ বেরিয়ে পরেছে ।
আমিনবাজারে গণপিটুনিতে ৬ টি তাজা প্রাণ ঝরে যায় , তখন পুলিশ চেয়ে চেয়ে দেখে
আর গাজার গল্প শোনায় ; আর এখন পুলিশই ডান্ডা হাতে তুলে নেয় আর গণপিটুনীর
নাটক মঞ্চস্থ করে। এই বর্তমানের বুকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশের
জন্যই কি দেশ স্বাধীন করা হয়েছিল। নিশ্চয়ই না। অতএব শুধরে যাওয়ার এসেছে সময়।
আরেক \'লিমন\'-এ পরিনত হলো কাদের । আব্দুল কাদের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত
পরিবারের সনত্দান। অনেক স্বপ্ন নিয়ে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫টি বছর শিক্ষা
জীবন অতিক্রম করে বর্তমানে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। ফজলুল হক মুসলিম হলের
আবাসিক এই মেধাবী শিক্ষার্থী বর্তমানে তিনটি টিউশনি করে স্বপ্নপূরণের
সংগ্রাম করে যাচ্ছিল। তার একমাত্র ছোট বোনটিও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে
বিবিএ-তে অধ্যয়ন করছে।পাঁচ বছরের অধিক সময়ের পরিচয়ে কাদেরের শিক্ষকবৃন্দ,
বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহপাঠীদের দৃঢ় বিশ্বাস কাদের ছিনতাইকারী হতে পারেনা।
কাদেরের আটক হওয়ার খবর জানতে পেরে এমনকি তার টিউশনের ছাত্রের অভিভাবকরা
পর্যন্ত তার বিভাগের চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং অত্যনত্দ দুঃখ ও
উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এর মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট হয় যে শুধুমাত্র সন্দেহের
বশবর্তী হয়ে এই অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে পুলিশ এবং দায় এড়ানোর
জন্য একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে চলেছে। তার নামে পুলিশ একে একে
ডাকাতির পূর্বপ্রসত্দুতি ও অস্ত্র বহন ও গাড়ি ছিনতাইয়ের মিথ্যা অভিযোগে
তিনটি পৃথক মামলা দায়ের করেছে। মামলাগুলো থেকে কাদের জামিন পেয়েছে ঠিকই
কিন্তু কাদেরের দিনকে রাত করে দেয়া পুলিশ কর্মকতর্া-কর্মচারীদের বিরম্নদ্ধে
নেয়া হয়নি কোন রকম আইনী ব্যবস্থা। কেবলমাত্র সাময়িক বহিস্কার ছাড়া। পাশাপাশি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের রহস্যজনক ভুমিকার কথাও ভুলতে পারবে না দেশ
ও জাতি। কাদেরের সহপাঠিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে
প্রক্টর সাইফুল আলম বলেন, তোমরা একটা ডাকাতের জন্য এতজন কেন এসেছ? কয়েকজন
আসলেই তো হত। এটাকে একটা ইস্যু বানাতে নিষেধ করেন কাদেরের সহপাঠীদেরকে।
কাদেরের উপর যেন আর নির্যাতন না হয় এজন্য প্রক্টরকে অনুরোধ করলে তিনি
জানান পুলিশকে ফোন করতে তার লজ্জা লাগছে। এমন কি প্রক্টর এখন পর্যন্ত
কাদেরকে দেখতে যান নি। একটা ধর্ষককে বাচাতে প্রশাসন উঠেপড়ে লাগে , একটা খুনি
ক্ষমা পেয়ে যায় আর একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রের উপর ববর্র নির্যাতন বন্ধের
জন্য অনুরোধ করতে কিনা প্রক্টরের লজ্জা লাগে ! লজ্জাতো তাঁর কাছে লাগতেই
পারে, যার অনত্দরজুড়ে কেবলমাত্র লজ্জা আর লজ্জা। যাইহোক, সম্প্রতি ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রথম অনলাইন পত্রিকা ডিইউনিউজ টুয়েন্টিফোর
ডটকম-এর সম্পাদক পলাশ চক্রবতর্ীসহ প্রায় ৩০ জন সাংবাদিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রেসক্লাব গঠন করার উদ্দ্যেগ নিলে পলাশ চক্রবতর্ীসহ অন্যদেরকে এই প্রক্টর
ডেকে নিয়ে বহিস্কারের হুমকি দিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। হায়রে , এত লজ্জা
নিয়ে তিনি ঘুমান কিভাবে ? লজ্জায়তো তাঁর বউয়ের কাছে যাওয়ার উপায়ও হারিয়ে
যাওয়ার কথা। আদালতের কান্না দেখে যে কারোই মন গলে যেতে পারে। কিন্তু গলেনি
পুলিশ বাহিনীর; কারন, পুলিশ মানেই ডাস্টবিনের ময়লা-আবর্জনা। এদের না আছে
কোন মন, না আছে কোন মায়া। এদের মধ্যে দানা বেঁধে আছে লোভ আর মোহ।' ঘটনার
রাতেই খিলগাঁও থানায় নেওয়ার পর ওসি আমাকে বেধড়ক মারেন। বলতে থাকেন, তুই
ডাকাতির জন্য এসেছিলি। ডাকাতি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলি। আদালতে এমন
স্বীকারোক্তি দিতে হবে।\' এ পর্যনত্দ বলে আবার একটু সময় থেমে থাকে কাদের।
চেক লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরা কাদের গামছা দিয়ে চোখ মুছে। তারপর বলে, \'আমি
ডাকাতির স্বীকারোক্তি দিতে অস্বীকার করলে ওসি আমাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত
করেন।\' সেই দৃশ্য মনে করে কেঁদে ফেলে সে । কাঁপছিল তার পুরো দেহ। কাদছিলো
পুরো মানবতা । এ সময় আদালত কক্ষে পিনপতন নীরবতা। আদালতে দাঁড়ানো খিলগাঁও
থানার ওসি হেলাল উদ্দিনকে উদ্দেশ করে আদালত বলেন,\" কী খবর ওসি সাহেব? এসব
কী শুনছি?\" জবাবে ওসি বলেন, \"এসব কথা সত্য নয়।\" এরপর আদালতের নির্দেশে
কাদের গেঞ্জি খোলে। তার পুরো শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখে উপস্থিত আইনজীবী,
সাংবাদিকসহ অন্যরা হতচকিত হন। বিস্ময় প্রকাশ করেন আদালত। হায়রে পুলিশ ,
পুলিশ থেকে মানুষ হবি কবে ? এই সেই বর্বর ওসি হেলাল উদ্দিন। যার অন্ধ
শাসনের জালে বন্দি হয়েছে শত শত নিরাপরাধ মানুষ। হেলাল উদ্দিন অপবাদের জাল
কাদেরের উপর ফেললেও কিন্তু বন্ধু বন্ধুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কাদেরকে যেই
রাতে আটক করা হয় , তার পর দিন সকালে খবর পেয়ে তার রুমমেট তাকে দেখতে যায় ,
পুলিশ তাকেও শাসায় । ঘটনার পরদিন সকালে সহপাঠিদের বিক্ষোভের মুখে বিভাগের
শিক্ষকগন বিশেষত বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন রশিদ ও অধ্যাপক
ড.আনোয়ার হোসেন এর উদ্যোগে আপাতত কাদের জামিনের চেষ্টা করা হচ্ছে। ২৮ জুলাই,
২০১১ বৃহষ্পতিবার বিকাল ৩টা মধুর ক্যান্টিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্যাতন
বিরোধী ছাত্র-ছাত্রীরা সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে দাবি জানানো
হয়, ১. অবিলম্বে আব্দুল কাদেরের বিরম্নদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা
প্রত্যাহারসহ নি:শর্ত মুক্তি চাই। ২. পুলিশী হেফাজতে কাদেরর উপর নির্যাতন
ও সাজানো মামলাকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিচার চাই। ৩. আব্দুল কাদেরের যথাযথ
চিকিৎসার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। ৪. সারাদেশে চলমান র্যাব-পুলিশের
বেপরোয়া নির্যাতন বন্ধ কর। ক'দিন পরপরই পুলিশ ও র্যাব এমন এমন একটি ঘটনার
জন্ম দেয়, যা সারা দেশের সাধারণ মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে। তারা অসহায়
বোধ করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইনবিহীন কর্মকান্ডে। এসব ঘটনার পরে
সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন হয়ে ওঠে
বেশ সরব। একটি ঘটনার আলোচনা মিইয়ে যায় আরেকটি ঘটনার জন্মের মধ্য দিয়ে।
একবার র্যাবের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তো আবার পুলিশের নির্যাতনের শিকার
হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। বাদ পড়ছে না স্কুলছাত্র থেকে শুরম্ন করে
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও। বর্তমানে জনগণ অসহায়ভাবে প্রত্যক্ষ করছে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদেরের ওপর পুলিশি নির্যাতনের ঘটনা। তার ক'দিন আগে
ছিল ঝালকাঠির কলেজছাত্র লিমন। তিনি পঙ্গুত্ববরণ করেছেন র্যাবের গুলিতে।
লিমনের ঘটনার আগে মিরপুরের কলেজছাত্র আবিরের হত্যাকান্ড ছিল আলোচনায়। এই
কলেজছাত্রকে বাসার কাছ থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে পুলিশ। পুলিশ মানেই যেন
অন্যায়ের দোসর, এই দোসররাই আমাদের সোনার বাংলাদেশে অন্যায়কে দিয়েছে
স্বাধীনতা। অন্যায় এখন যখন, তখন যেভাবে খুশি পাখা মেলে উড়ে বেড়ায়, তা শুধু
এই হায়েনাসম পুলিশের কারনেই। অথচ তাদের কোন বিচার হয় না; হয় না নূন্যতম
সাজাও। যে কারনে লিমনের মামালার অগ্রগতি হয়নি; বরং হুমকি দেয়া হচ্ছে মামলা
তুলে নেয়ার জন্য। চলতি বছরের ২৩ মার্চ বিকালে ঝালকাঠির রাজাপুরের সাতুরিয়ায়
র্যাবের গুলিতে আহত হন কলেজছাত্র লিমন। পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে
চিকিৎসকরা তার বাম পা কেটে ফেলেন। র্যাবের পক্ষ থেকে লিমনের বিরুদ্ধে
অস্ত্র ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দুটি মামলা দেওয়া হয়। এর মধ্যে
সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মামলায় ঝালকাঠির আদালত থেকে জামিন পান লিমন।
অন্যদিকে অস্ত্র আইনে দায়ের করা মামলায় পুলিশ গত ২৪ মার্চ চার্জশিট দাখিল
করে। পরে হাইকোর্ট থেকে গত ৫ মে ৬ মাসের অন্তবর্র্তীকালীন জামিন দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় একটি পা হারিয়ে পঙ্গু লিমনকে দীর্ঘ ৪৭ দিন হাসপাতাল ও জেলে আটক
থাকতে হয়। কিন্তু লিমনকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তার মা হেনোয়ারা
বেগম বাদী হয়ে র্যাবের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে রাজাপুর থানায় যে মামলা করেছেন
তিন মাস পার হয়ে গেলেও সে মামলাটির তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই এবং আসামিদের
বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন হেনোয়ারা বেগম।
তদন্ত কাজের দোহাই দিয়ে মামলার কাজে বিলম্ব করা হচ্ছে অভিযোগ লিমনের মায়ের।
অপরদিকে মামলার তদন্ত কাজ যে পর্যন্ত এগিয়েছে তাতে আসামিদের বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না মামলার তদন্ত কর্মকর্তা
রাজাপুর থানার উপ-পরিদর্শক আবদুল হালিম। এই ঘটনায় লিমনকে সন্ত্রাসী বানানোর
নানা চেষ্টা অব্যাহত ছিল। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন,
রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন এবং আদালতের কারণেই। কিন্তু লিমনের ঘটনায় ক্ষমতাসীন
সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা
সংবাদমাধ্যমকে লিমন সন্ত্রাসী বলে যে বক্তব্য দেন তাতে রীতিমতো বিস্মিত হতে
হয়। পুরো সরকারি কর্তাব্যক্তিরা এ ঘটনায় লিমন নয়, র্যাবের পাশেই
দাঁড়িয়েছেন। অন্যদিকে পুলিশের হাত এতটাই লম্বা হয়েছে যে, আবিরের ঘটনায় মামলা
পর্যনত্দ হয়নি : চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি নর্দার্ন কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা
বিভাগের ছাত্র ইমতিয়াজ আবিরকে রাজধানীর মিরপুর ১১নং সেকশনের বাউনিয়া বাঁধ
বালুর মাঠের বস্তিতে গুলি করে মেরেছে পল্লবী থানা পুলিশ। এই হত্যাকান্ডটির
পর পুলিশের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের কাছে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়
যেখানে লেখা ছিল- সোমবার রাত সোয়া ৯টায় মিরপুর ১১নং সেকশনের বাউনিয়া বাঁধ
বালুর মাঠে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আবির গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। সেখানে
আবির এবং তার লোকজন ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পুলিশের এমন বক্তব্য থাকলেও
পল্লবী থানার অপারেশন অফিসার ফিরোজ হোসেন মোল্লা স্বীকার করে বলেছেন,
আবিরের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি তাদের থানায় নেই। নিহতের বাবা তিতাস
গ্যাসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) কাজী গোলাম ফারুক জানান, পুলিশ তার
ছেলেকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। এই ঘটনায় কোনো মামলাও করেনি আবিরের
পরিবার। এ প্রসঙ্গে আবিরের এক মামা নিজের পরিচয় গোপন রেখে বলেন, মামলা করে
কোনো লাভ হবে না। আমরা পুলিশের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, তারা
মামলা করতে নিষেধ করেছেন। তাদের দাবি মামলা করেও কোনো লাভ হবে না। কাদের
পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর হয়ে গেলেন ডাকাত। শিকার হলেন পুলিশি নির্যাতনের।
হাজতবাসেও বাধ্য হলেন। কেউই কিছু জানছিল না। কিন্তু ঘটনার ১০ দিন পার হতেই
বিষয়টি চলে আসে গণমাধ্যমে। শুরম্ন হয় দেশজুড়ে আলোচনা। প্রতিবাদ হয় ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ে। অবশেষে যদিও উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে তিন পুলিশ বরখাসত্দ
হয়েছে। লিমন ঝালকাঠির প্রত্যনত্দ অঞ্চলের গরিব ঘরের কলেজ পড়ুয়া সনত্দান।
বিকাল বেলায় বাড়ির পাশেই দুঃস্বপ্নের মতো পায়ে এসে গুলি লাগে। এই গুলি
ছুড়েছে র্যাব। এই ঘটনাটিও গণমাধ্যমের কল্যাণে জেনে যায় সারা দেশ। ঘটনাটি
ব্যাপক সমালোচিত হয় দেশে-বিদেশে। লিমনের পাশে এসে দাঁড়ায় গণমাধ্য,
মানবাধিকার সংগঠন, আদালত এবং অসংখ্য মানুষ। মানুষের এই অবস্থান লিমনের পা
ফিরিয়ে দিতে পারবে না, বা কাদেরের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তা পুষিয়ে দিতে
পারবে না। তবুও তারা প্রাণে বেঁচে যাচ্ছে। তাদের বিষয়ে বাহিনীগুলোর সব
সিদ্ধান্তই হচ্ছে সাবধানে। এজন্যই তারা ভাগ্যবান। কিন্তু এমনও অসংখ্য ঘটনা
ঘটছে যেগুলো মানুষ জানছেই না। আবার যা জানছে তাও নানা অসত্য গল্পের আবরণে।
আলোচনায় আসে না এমন ঘটনা অসংখ্য : সাপ্তাহিক বুধবার ও বিভিন্ন মানবাধিকারের
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিদিনই এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে দেশের বিভিন্ন
এলাকায়। এসব ঘটনার বেশির ভাগই সংবাদ হয়ে ওঠেনা। খোঁজ পায়না মানবাধিকার
সংগঠনগুলোও। আবার কিছু মানুষ খুব বেশি সাধারণ হওয়ায় তাদের জন্য এগিয়েও আসে
না কেউ। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর রামপুরায় পুলিশের সঙ্গে কথিত 'বন্দুকযুদ্ধে'
শ্যামল (২৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় গুলিতে আহত হয় অনিক (১৭)
নামে এক কিশোর। পুলিশের ভাষ্যমতে, রাত পৌনে ২টার দিকে রামপুরার মহানগর
প্রজেক্ট বালুর মাঠ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ গুলিবিদ্ধ দু'জনকে উদ্ধার করে
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করলে পরদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে
শ্যামলের মৃত্যু হয়। অনিককে একই হাসপাতাল থেকে পাঠানো হয় কারাগারে। পুলিশ
দাবি করছে, নিহত শ্যামল ও গুলিবিদ্ধ অনিক ছিনতাইকারী দলের অস্ত্রধারী সদস্য।
তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে থানায় কয়েকটি মামলা রয়েছে। তবে শ্যামল ও
অনিকের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে গুলি করেছে।
পুলিশের চাহিদামতো টাকা না দেওয়ায় তাদের গুলি করা হয়েছে। অনিকের খালা রোকেয়া
বেগম জানান, অনিক পূর্ব রামপুরার মোল্লাবাড়িতে ভাড়া থেকে একটি কম্পিউটারের
দোকানে কাজ করত। ঘটনার দিন দুপুরে সে বাসা থেকে সালামবাগ জামে মসজিদে নামাজ
পড়তে গেলে পুলিশ তাকে সেখান থেকে ধরে নিয়ে যায়। রাতে তাকে অজ্ঞাত নম্বরে
ফোন করে বলা হয় অনিককে পুলিশ আটক করেছে। পরেরদিন সকালে টেলিভিশনের খবরে তারা
জানতে পারেন অনিক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে পড়ে আছে। একই মাসের ১২
তারিখে পুরান ঢাকার ইংলিশ রোডে র্যাবের হাতে মারা যায় অপু নামের এক যুবক।
পুলিশের দাবি, নিহত অপু ডাকাত শহীদের অন্যতম সহযোগী। কোতোয়ালি থানা সূত্র
জানায়, র্যাব-১০-এর লালবাগ ক্যাম্পের একটি দল রাত পৌনে ২টায় পুরান ঢাকা
এলাকায় টহলের দায়িত্ব পালন করছিল। এ সময় ৭/এ, ইংলিশ রোডের সামনে ৭/৮
সন্ত্রাসীকে আড্ডা দিতে দেখে। র্যাবের টহল দল তাদের চ্যালেঞ্জ করলে তারা
র্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। র্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। সন্ত্রাসীদের
সঙ্গে র্যাবের গোলাগুলির একপর্যায়ে অপু গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে
এবং অন্যরা পালিয়ে যায়। পরে র্যাব সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে মিটফোর্ড
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
চলতি বছরের ১১ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকা মহানগরীর কোতোয়ালি থানাধীন ৪৫/২,
প্রসন্ন পোদ্দার লেনের বাসিন্দা মৃত নাসির উদ্দিন আহম্মেদ নেসারের ছেলে মো.
রাসেল আহম্মেদ ভুট্টোকে (৩৪) জিন্দাবাহার এলাকায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা
পাকের্র ভেতরে র্যাব-১০-এর ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানি (সিপিসি)-৩ লালবাগ
ক্যাম্পের সদস্যরা গুলি করে হত্যা করে বলে নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে।
রাসেলের পরিবার জানায়, রাসেলকে গত ৩ মার্চ সন্ধ্যায় ২০, নিউ ইস্কাটন রোডের
ইস্টার্ন টাওয়ার শপিং পয়েন্টে তার এক বন্ধুর দোকানের সামনে থেকে
সাদাপোশাকধারী র্যাব সদস্যরা আটক করে নিয়ে যায়। গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাত
সাড়ে ৯টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ২নং ঢাকেশ্বরী বাসস্ট্যান্ড থেকে র্যাপিড
অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ১১ সিপিসি-১-এর সদস্যরা মো. ফজলুল হক ফজলকে
(৪৪) গ্রেফতার করে এবং একই থানার আটি হাউজিং এলাকার আবু মিয়ার খালি প্লটে
তিনি নিহত হন। ফজলের পরিবার অভিযোগে জানান, ১৪ নভেম্বর ভোর ৪টার দিকে
নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার লামাপাড়া গ্রামের ফজলুলকে র্যাব সদস্যরা
ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। গত ৬ মার্চ শাহবাগ থানার পুলিশ সদস্যরা
শাহবাগ মোড় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রথম
বর্ষের ছাত্র রহমত উল্লাহকে গ্রেফতার করে তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছে বলে
অভিযোগ করেছে রহমত উলস্নাহর পরিবার। এসব ছাড়াও মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের
তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিচারবহির্ভূতভাবে আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন ৪৯ জন। গত বছর নিহত হয়েছেন ১৪৯ জন। আর নির্যাতন,
নিপীড়ন এবং সীমাহীন অত্যাচারের শিকার শুধু কাদের, লিমনই নয়- অসংখ্য।
মানবাধিকার সংগঠন বা সংবাদপত্রের পাতায় এদের হাতে গোনা কয়েকজনের খবর এসেছে
মাত্র। খবরতো তারাই হচ্ছেন যারা আইন জানেন, বোঝেন। কিন্তু যারা আইন জানে
না, জানে না প্রতিবাদের ভাষা তারা চলে যাচ্ছেন নিযর্াতন সইতে সইতেই। এই
পরিস্থিতির উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সরকারের আরো কঠোর পদৰেপ; তা না হলে ঘটতেই
থাকবে দূর্ঘটনা; হতেই থাকবে দূর্ণাম।
email:
mominmahadi@gmail.com |
|