|
|
দূর্নীতির সুযোগে গড়ে উঠছে অনুমতিহীন স্কুল এন্ড কলেজ
মোমিন মেহেদী
সারাদেশে শিক্ষা অফিসে দুর্নীতি ঘুষের নানা রকম
ফাঁদ পেতে রেখেছে সরকারী কর্মকর্তারা৷ সুযোগ দিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়৷
তাদের এই ফাঁদে পা দিয়ে স্বর্বস্ব খোয়াচ্ছে সাধারন মানুষ৷ জেলা ও উপজেলা
শিক্ষা অফিসে নগদ নারায়ণই ফাইল নড়ানোর মুখ্য দাওয়াই৷ ফাইল আটকে নির্দ্বিধায়
শিক্ষকদের সামনে হাত পেতে দিচ্ছেন শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা-কর্মচারীরা৷
বিভিন্ন সময় কর্মকর্তারা সরাসরি হাত পেতে না নিলেও শিক্ষকরা বিশ্বাস করেন,
তাদের দেওয়া অর্থ কর্মকর্তাদের পকেটেও বিভিন্ন হাত ঘুরে ঘুরে যায়৷ বেতনের
অর্থ ছাড় করাতে, ছুটি নিতে, পরিদর্শন প্রতিবেদন পক্ষে আনতে, উপবৃত্তি পেতে
ও নিয়োগ সংক্রানত্ম নানা বিষয়ে শিক্ষা অফিসগুলোতে শিক্ষকরা গিয়ে ঘুষ দিতে
বাধ্য হচ্ছেন৷ না দিলে ফাইল নড়ে না৷ দিনের পর দিন ঘুরে হন্যে হতে হয়৷
সমপ্রতি দেশের বড় কয়েকটি জেলার শিক্ষা অফিসগুলোতে
সরেজমিন অনুসন্ধান চালানো হয়৷ এতে দুর্নীতির প্রকট চিত্র ফুটে উঠেছে৷ একটি
সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধির সাথে আলাপকালে শিক্ষামন্ত্রী নুরম্নল ইসলাম
নাহিদও তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষা অফিসে অনিয়ম-দুর্নীতির কথা স্বীকার করেন৷ তিনি
বলেন, 'জেলা-উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা অফিসগুলো রাতারাতি দুর্নীতিমুক্ত হয়ে
গেছে এ কথা বলার সুযোগ নেই৷ কিছু সমস্যা তো সেখানে রয়েছেই৷ আবার এ
অফিসগুলোতে যারা কাজ করছেন তারা সবাই সেভাবে দক্ষও নন৷ এ কারণে শিক্ষকদের
হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না৷' তিনি বলেন, পরিদর্শন ও মনিটরিং বাড়ানোর জন্য আমরা
জেলা প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করব৷ সমপ্রতি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে তাদের এ
নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে৷ কিছুদিন আগে বিভাগীয় কমিশনারদের সঙ্গে সভা করে
তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা অফিসগুলোর নিয়মিত পরিদর্শন ও মনিটরিং
করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷ যেখানে শিক্ষা মন্ত্রী নিজেই অসহায়ত্ব প্রকাশ
করেছেন, সেখানে প্রয়োজন এখন সরকারের সরাসরি পদৰেপ এই দূনর্ীতি বন্ধের জন্য৷
তা না হলে শিক্ষা বিভাগের ম একটি বিভিাগে নেমে আসবে অন্ধকারের কালো৷ যা
আমাদের কারোই কাম্য নয়৷ সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়, খুলনায় টাকা ছাড়া কোন
কাজই হয়না শিক্ষা দপ্তরে৷ কেন কাজ হয় না? এমন প্রশ্নের উত্তরে বেরিয়ে আসে
থলের বিড়াল৷ খুলনা জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অফিসে বিভিন্ন কাজে যাওয়া
শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন৷ টাকা না দিলে কোনো কাজই হয় না বলে
অভিযোগ রয়েছে৷ চাকরি নিয়ে ঝামেলা হওয়ার ভয়ে শিক্ষা অফিসের কাছে শিক্ষকরা এক
প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন৷ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অভিযোগ করে সংবাদ
মাধ্যমকে বলেন, নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির জন্য জেলা শিক্ষা
অফিসের মাধ্যমে কাগজপত্র ঢাকায় মহাপরিচালকের অফিসে পাঠাতে হয়৷ কাগজপত্র
যথাসময়ে ঢাকায় পাঠানোর জন্য জেলা শিক্ষা অফিসে ৩ থেকে ৬ হাজার টাকা
পর্যনত্ম ঘুষ দিতে হয়৷ শুধু এখানেই শেষ নয়, নিয়োগ সংক্রানত্ম কোনো জটিলতা
থাকলে ঘুষের অঙ্কও বেড়ে যায়৷ শিক্ষকরা জানান, এমপিও ভুক্তরা চার বছর পর পর
উচ্চতর স্কেলের জন্য জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে মহাপরিচালকের অফিসে
সংশিস্নষ্ট কাগজপত্র পাঠান৷ বিএড করার পর বিএড স্কেলে উন্নীত হওয়ার জন্যও
একইভাবে কাগজপত্র পাঠাতে হয়৷ এ কাগজপত্র পাঠাতে জেলা শিক্ষা অফিসে ২ হাজার
থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যনত্ম উত্কোচ দিতে হয়৷ শিক্ষকদের অভিযোগ, হিসাবরক্ষক
শেখ ফরিদ নিজে শিক্ষকদের কাছ থেকে এই উত্কোচ গ্রহণ করেন৷ স্থানীয় ঊধর্্বতন
কর্মকর্তারাও এ টাকার ভাগ পান৷ তবে হিসাবরক্ষক শেখ ফরিদ এসব অভিযোগ
অস্বীকার করে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, তিনি আনত্মরিকতার সঙ্গে শিক্ষকদের কাজ
করে দেন৷ কখনও টাকা দাবি করেন না৷ একাধিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান,
বিদ্যালয়ে নতুন শাখা খোলার সময় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অথবা তার প্রতিনিধি
বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন৷ নতুন শাখার অনুমতি পেতে শিক্ষা অফিসে টাকা দিতে হয়৷
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ
কুমার সাহা সংবাদমাধ্যমকে জানান, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে শিক্ষকদের হয়রানি ও
উত্কোচ গ্রহণের কথা তিনিও মাঝেমধ্যে শোনেন৷ তবে লিখিতভাবে কেউ সমিতিকে
জানান না৷ তাই এ নিয়ে অগ্রসর হওয়া যায় না বলে তিনি মনত্মব্য করেন৷ শিক্ষা
কমকর্তার এ বিষয়ে তাদের বক্তব্যে বলেছেন দায়সার া গোছের কথা৷ তারা সকল
অভিযোগ অস্বীকার করে সাংবাদিকদেরকে বলেছেন, এমপিও'র কাগজ পাঠানো, নিয়োগ ও
নতুন শাখা খোলা বা অন্য কোনো কাজে তিনি কখনও উত্কোচ গ্রহণ করেন না৷ তিনি
বা তার অফিসের কেউ শিক্ষকদের হয়রানিও করেন না৷ ডুমুরিয়া উপজেলা শিক্ষক
সমিতির সভাপতি আবদুর রশীদ সম্প্রতি একটি পত্রিকাকে জানিয়েছেন, গত এক বছরে
ডুমুরিয়ার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে৷ অধিকাংশ বিদ্যালয়ে
নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের কাছ থেকে ১ থেকে ৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে৷ এর
একটি অংশ মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির
কর্মকর্তারা পেয়েছেন৷ বাকি টাকা ডোনেশন হিসেবে বিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা হয়েছে৷
উপবৃত্তির টাকা গ্রহণের সময় শিক্ষা অফিসে কিছু টাকা দিতে হয়, যা ছাত্রীদের
কাছ থেকে কেটে রাখা হয়৷ রাজশাহীতে শিক্ষক হয়রানি এখন তুঙ্গে বলে জানিয়েছেন
স্থানিয় শিক্ষকবৃন্দ৷ রাজশাহীর উপজেলা শিক্ষা অফিসগুলোতে প্রতিনিয়ত শিক্ষক
হয়রানি চলছে৷ শিক্ষা কর্মকর্তাদের দর্ুর্নীতি, অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, কোনো
কোনো স্কুলে জাল সার্টিফিকেটে শিক্ষক নিয়োগের ঘটনাও ঘটেছে৷ বিভিন্ন সময়ে
স্কুলপ্রধানদের বিরম্নদ্ধে এলাকার লোকজন অভিযোগ তুললেও তা আমলে না নিয়ে
উল্টো শিক্ষকদের সহযোগিতা করে অনিয়মে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে৷ সমপ্র্রতি
রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী তার নির্বাচনী এলাকার একটি
ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষের বিরম্নদ্ধে লিখিত অভিযোগ করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া
হয়নি৷ এ ব্যাপারে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিলুলস্নাহ সংবাদমাধ্যমকে
জানান, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরম্নদ্ধে শিক্ষকরা কখনও তার কাছে কোনো
অভিযোগ করেননি৷ তবে শিক্ষকরা হয়রানি হচ্ছেন এমন অভিযোগ পেলে তিনি ব্যবস্থা
নেবেন৷ ফরিদপুরে নিয়োগ বাণিজ্য ১২ মাসই চলে৷ ফরিদপুর জেলা শিক্ষা এবং জেলা
প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য চলে ১২ মাস৷ মাধ্যমিক
পর্যায়ের স্কুলের স্বীকৃতি নবায়ন, ম্যানেজিং কমিটি গঠন ও অনুমোদন এবং শাখা
অনুমোদনের জন্য স্থানীয় অফিস থেকে শুরম্ন করে ডিজি অফিস পর্যনত্ম বিভিন্ন
সত্মরে শিক্ষকদের ধাপে ধাপে ঘুষ দিতে হয়৷ এ ছাড়া উপবৃত্তির টাকা নিয়ে অনিয়ম
ও দুর্নীতি ঘটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় ক্ষেত্রেই৷ শিক্ষা বিভাগের
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এসব দুর্নীতির সহযোগীর ভূমিকায় রয়েছেন শিক্ষক সমিতির
দুর্নীতিগ্রস্থ নেতারা৷ অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা বিভাগের এসব দুর্নীতি
ও অনিয়মের কারণে মূলত হয়রানির শিকার হন সাধারণ শিক্ষকরা৷ ফরিদপুর সদরসহ
জেলার সব উপজেলাতেই মাধ্যমিক সত্মরের বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ
নিয়ে চলে ব্যাপক বাণিজ্য৷ পদাধিকারবলে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা শিক্ষক
নিয়োগ কমিটির সদস্য৷ ফলে উপজেলার যে কোনো স্কুলে নিয়োগ হলে সেখান থেকে মোটা
অঙ্কের টাকা নিয়ে থাকেন কর্মকর্তারা৷ বিশেষ করে পৌর এলাকার বাইরের
স্কুলগুলোতে প্রতি শিক্ষক নিয়োগে কমপক্ষে এক লাখ টাকা নেন শিক্ষা কর্মকর্তা৷
এ ছাড়া নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ফাইল ডিজি অফিসে পাঠানোর জন্য ৫ থেকে ১০
হাজার টাকা, বেতনের বিএড স্কেলের জন্য ২/৩ হাজার টাকা এবং টাইম স্কেলের
জন্য ৩/৪ হাজার টাকা দিতে হয় জেলা শিক্ষা অফিসে৷ ছোটখাটো কাজেও ১/২ হাজার
টাকা দিতে হয় বলে জানান ভুক্তভোগী শিক্ষকরা৷ এসব ফাইল ডিজি অফিস থেকে ছাড়
করাতে প্রতিটি স্কুলকে ব্যয় করতে হয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা৷ উপজেলা
মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে আসা উপবৃত্তির টাকা ছাড় করিয়ে নিতে প্রতিটি স্কুলকে
২/৩ হাজার টাকা দিতে হয় উপজেলা শিক্ষা অফিসের কর্মচারীদের৷ এ ছাড়া মাধ্যমিক
স্কুলগুলোতে স্থানীয় নেতা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকদের
যোগসাজশে ত্রাণের টিন, টিআরের গম ইত্যাদি বরাদ্দ এনে তার সিংহভাগই আত্মসাত্
করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়৷ ঠিক এমনি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড
আর শিক্ষা কমিশনে চলছে দূনর্ীতির মহোত্সব৷ যার সুযোগ নিচ্ছে রায়হান স্কুল
এন্ড কলেজ, আল মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়, আল হেরা একাডেমী, আল ফারম্নক একাডেমী,
প্রত্যাশা একাডেমী, ফুলকুঁড়ি কিন্ডার গার্ডেন, ইসলামী ব্যাংক স্কুল এন্ড
কলেজ, মমতাজ আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, কাজী দ্বীন মোহাম্মদ স্কুল এন্ড কলেজ,
ইবনে সিনা স্কুল এন্ড কলেজ, ওমর ফারম্নক একাডেমী, আলস্নামা মওদুদী একাডেমীর
মত শত শত ধর্মব্যবসায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান৷ এদের আড়ালে ঘুপটি মেরে আছে
দূনর্ীতির কুত্সিত্ মুখ৷ এদেরকে প্রতিহত করতে প্রয়োজন সরকারের সাহসী
পদৰেপ তা না হলে অচিরেই মেধা শূণ্য হয়ে পড়বে বাংলাদেশ, মেধা শূণ্যতার সুযোগে
ঘরবসতি গড়বে জামায়াতে ইসলাম আর জঙ্গি সংগঠনগুলো৷ সম্প্রতি আজিমপুরে অবস্থিত
জামায়াত-বিএনপির মদদপুষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রায়হান স্কুল এন্ড কলেজে সংবাদ
সংগ্রহের জন্য কয়েকজন সাংবাদিক গিয়ে দেখতে পায়, কোটি কোটি টাকা ব্যায় করে
নির্মিত এই স্কুলে রয়েছে চারসত্মর বিশিষ্ট গোপনিয়তা৷ যার আড়াল ভাঙ্গা যায়নি
কোনভাবেই৷ অবশেষে দুই মিনিট কথা বলার সুযোগ হয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক
রহিমা আফরোজের সাথে৷ দুই মিনিট সময় নিলেও সাংবাদিকদেরকে দুই সেকেন্ডেই
উত্তর দিয়ে দেন রহিমা আফরোজ৷ উত্তরটি হলো, চেয়ারম্যান মহদোয়ের অনুমতি ছাড়া
কথা বলতে পারবো না।
email:
mominmahadi@gmail.com |
|