[প্রথমপাতা]

 

 

 

অনবদ্য সাহসমানুষ ফয়েজ আহমদ: লাল সালাম ও শ্রদ্ধা

 

মোমিন মেহেদী

 

 

‘আজ ভোরে সত্যবাবু মারা গেছেন। মধ্যরাতের অশ্বারোহী আর সত্যের খোঁজে দাপিয়ে বেড়াবেন না শহরের অলিগলি। ছড়াকার-সাংবাদিক-সংস্কৃতিনেতা ফয়েজ আহমদ আহমদই আমাদের সত্যবাবু। তিনি আমাদের মধ্যরাতের অশ্বারোহ। তাঁর সাথে পরিচয় সেই ১৯৮৫ সাল থেকে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে। জাতীয় কবিতা পরিষদ করতে এসে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ ঘটে। তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২, মাত্র দুই সপ্তাহ আগে। বাংলা একাডেমীর রবীন্দ্রমঞ্চের অনুষ্ঠানে ভাষাশহিদ আবদুল জব্বার ও শফিউর রহমানকে নিয়ে লেখা মূল প্রবন্ধ পাঠ করছিলাম আমি। আলোচক ছিলেন ড. শিহাব শাহরিয়ার, আন্দালিব রাশদী এবং শফিকুর রহমান চৌধুরী। ওই মঞ্চে শহিদ অহিউল্লাহকে নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করছেন জামিল চৌধুরী। আমার গর্ব যে সভাপতির আসনে ছিলেন সত্যবাবু ফয়েজ আহমেদ। সম্ভবত এটাই তাঁর শেষ সভাপতিত্ব। আর তাঁর শেষ সভাপতিত্বে মূল আলোচক ছিলাম আমি। আমাদের কালের এক শ্রেষ্ঠ নায়কের প্রস্থানে আমরা মর্মাহত, শোকগ্রস্থ। অকৃতদার এই মহামানবের স্মৃতর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।’ বাংলা একাডেমীর উপ পরিচালক কবি ও গবেষক তপন বাগচীর এই লেখাটি পড়ার সাথে সাথে সকল স্মৃতি হুমড়ি খেয়ে পড়ে মনের উঠোনে। সেখানে নতুন করে দেখতে থাকি ছড়াকার ও রাজনীতিবিদ ফয়েজ আহমদকে। যার হাত ধরে বাংলাদেশ এগিয়েছে যোজন যোজন পথ। নির্মিত হয়েছে আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আর রাজনৈতিক অসংখ্য সংগঠক-কর্মী। তাঁর-ই হাত ধরে ভালোবাসাময় বিপ্লবকে বেছে নিয়েছিলাম জীবনের জন্য। যে কারনে জামায়াত-শিবির আর সা¤্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সবসময়-ই ছিলাম সোচ্চার। যদিও শেষ দিকে এসে সেই জামায়াত-শিবিরের কিছু প্রেতাত্মা ঘিরে ধরেছিল আমাদের লাল পতাকার বিপ্লবী মুখটিকে। ডাকটিকিট, মাস্তুল আর কানামাছি নামের জামায়াত-শিবির-জঙ্গীবাদ কাগজের প্রিন্টার্স লাইনে তাঁর নাম ব্যবহার করেছে অনুমতি না নিয়েই। বিভিন্ন সময় আন্দোলনে সংগ্রামে ঝলসে ওঠা সাহসমানুষ আমাদের অনবদ্য উৎসাহ ছড়াকার ফয়েজ আহমদ। বাংলারিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম-এর জন্য নেয়া এক সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারি, 'সওগাত'-এ প্রকাশিত 'আসুন চুরি করি' শীর্ষক মুনীর চৌধুরীর একটি ব্যাঙ্গাত্মক লেখা পড়ে ফয়েজ আহমদ এতই আপ্লুত হয়েছিলেন যে তিনি কলকাতা গিয়ে তাঁর সাথে পরিচিত হবার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন। পত্রিকা পড়ার আগ্রহের পাশাপাশি ছেলেবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল খুব। ফলে ১৯৪৪ সালে ষোল বছর বয়সেই 'শিশু সওগাত'-এ ফয়েজ আহমদের লেখা 'নাম বিভ্রাট' শিরোনামে একটি রচনা প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম মুদ্রিত লেখা। এলেখা প্রকাশের পর গ্রামে ও স্কুলে তাঁর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এরপর তিনি কলকাতা যাবার বিষয়ে আর কারো কোন বাধা মানেননি। একদিন স্কুলের বেতন না দিয়ে ক্লাস পালিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন কলকাতার পথে। সাথে সম্বল ছিল শুধু স্কুলের বেতন , বই কেনার সামান্য টাকা আর শিশু সওগাতের সেই সংখ্যাটি যাতে তাঁর লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল। ছেলেবেলা থেকে পত্রিকা পাগল ও লেখালেখির সাথে জড়িত ফয়েজ আহমদ পরবর্তী জীবনে সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সবার কাছে পরিচিতি লাভ করেন। ফয়েজ আহমদ ১৯২৮ সালের ২ মে বিক্রমপুরের বাসাইলডোগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম গোলাম মোস্তফা চৌধূরী। তাঁর দাদা গোলাম সারওয়ার চৌধুরীর সময় থেকে উচ্চস্তরের লেখাপড়ার আয়োজন শুরু হয়। দাদা বহু জায়গা জমির মালিক হয়ে একটি সামন্ত পরিবারের প্রধান হয়ে দাঁড়ান। তখন তাঁর নাম হয় চাঁদ মিয়া বা চান মিয়া, অর্থাৎ চাঁদের মতো কপাল বলেই তিনি ধনী। তাঁদের বাড়িতে অলিখিত বিধান ছিলো যে ছেলেরা লেখাপড়া শেষ করে সরাসরি সরকারী চাকরিতে যাবে। এমনকি ব্যবসা করার রীতিও তাঁদের বাড়িতে ছিলনা। তাঁরা ছিলেন ক্ষুদ্র সামন্ত পরিবার, যেখানে প্রজা সাধারণ ও খাস জায়গা জমির আধিপত্য ছিলো বিশাল। যেহেতু সরকারী চাকরি সে আমলে একটা গৌরবের বিষয় ছিলো, সেহেতু তাঁর ভাইদের সরকারী চাকরির দিকেই ঠেলে দেয়া হয়েছিলো। তাঁদের এলাকায় মুসলমানদের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রচলন ছিলনা বললেই চলে। হিন্দুরা মূলত ব্যবসা করতো। ধোপা, নাপিত, মুচি, মিষ্টির কারিগররা সবাই ছিলেন হিন্দুদেরই বিভিন্ন শাখার মানুষ। এই পরিবেশের মধ্যে ষোলঘর স্কুলে যখন তিনি বর্ধিত হচ্ছিলেন, তখন তিনটি বিষয় তাঁকে প্রভাবিত করে। এগুলো হলো দেশ বিভাগ, ৪২ সালের ভারত ছাড় আন্দোলন এবং বাংলা ৪২-৪৩ সালের মহামন্বন্তর। তখন থেকেই ভেতরে ভেতরে তিনি যেন একটি ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। এইসব পারিপার্শ্বিকতা তাঁকে আছন্ন করে রেখেছিল। তিনি তাঁর বাড়িতে ভাইদের মধ্যে ব্যতিক্রমী চরিত্র হয়ে ওঠেন। ব্যতিক্রমী চরিত্রের অধিকারী ফয়েজ আহমদ সাহিত্যের প্রতি দুর্বার টানে ১৯৪৪ সালে ষোল বছর বয়সে স্কুল ফাঁকি দিয়ে কলকাতার সওগাত অফিসে পৌঁছাবার পর প্রথমে তাঁর পরিচয় হয় বিখ্যাত দুই কবি আহসান হাবীব ও হাবীবুর রহমানের সাথে। হাবীবুর রহমান ও আহসান হাবীব তাঁকে আরো লেখার জন্য উৎসাহিত করেন। 'শিশু সওগাত'-এ প্রকাশিত ফয়েজ আহমদের লেখাটি প্রকৃত পক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল বড়দের লেখা হিসাবে। ফয়েজ আহমদের সাথে 'সওগাত' পত্রিকার সকলের একটি সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়। দেশ বিভাগের পর 'সওগাত' পত্রিকা ঢাকায় চলে আসে। 'সওগাত' অফিসেই নাসিরুদ্দিন সাহেবের সর্বাত্মক সহযোগিতায় প্রগতি ও মুক্তবুদ্ধির ধারক হিসেবে পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের জন্ম হয়। ফয়েজ আহমদ সেসময় এই সংসদের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ঢাকায় একটি সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল গড়ে তোলার অনন্য প্রয়াস নিয়েছিলেন। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আইবির লোকজন তাঁদের পেছনে লেগে থাকতো। ফয়েজ আহমদের সাথে সাথে সাম্প্রদায়িকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে এ প্রতিষ্ঠানে যাঁরা প্রকাশ্যে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক অজিত গুহ, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক সৈয়দ নুরুউদ্দিন, অধ্যাপক সরোয়ার মোর্শেদ, আবদুল গণি হাজারী, মুনীর চৌধুরী, কবীর চৌধুরী, কবি শামসুর রহমানসহ আরও অনেকে। এছাড়াও কয়েকজন উর্দু প্রগতিশীল কবি সাহিত্যিক ফয়েজ আহমদ ও তাঁর সংসদের ডাকে তাঁদের সাথে সামিল হয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ফয়েজ আহমদদেরকে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ফয়েজ আহমদ সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে সাংগঠনিক কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। ১৯৫২ সালে ঢাকায় সম্মেলন করার অনুমতি না পাওয়ার কারণে কুমিল্লাতে স্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ আয়োজন করে একটি সাংস্কৃতিক সম্মেলন। এরপর তিনি এই সংসদের পক্ষ থেকে ১৯৫৪ সালে ঢাকার কার্জন হলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উপর একটি সম্মেলন আয়োজন করেন। এই সম্মেলনে কলকাতা থেকে বহু বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক, গায়ক- গায়িকা অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তিনি ১৯৪৮ সাল থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন। যারা এই ভূ-খন্ডের সংবাদ মাধ্যমকে দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন ফয়েজ আহমদ ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি 'ইত্তেফাক', 'সংবাদ', 'আজাদ' ও পরবর্তীতে 'পূর্বদেশ'-এ চীফ রিপোর্টার ছিলেন। তিনি সাপ্তাহিক 'ইনসাফ' ও 'ইনসান' পত্রিকায় রিপোর্টিং করেছেন। ১৯৫০ সালে 'হুল্লোড়' এবং ১৯৭১ সালে 'স্বরাজ' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি জাতীয় সংবাদ সংস্থার প্রথম প্রধান সম্পাদক নিযুক্ত হন। পরে দৈনিক 'বঙ্গবার্তা'-র প্রধান সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাবার পর তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে বিশেষভাবে জড়িত হন। ১৯৪৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ গঠিত হয় তখন ফয়েজ আহমদ মওলানা ভাসানীর সঙ্গে আওয়ামী লীগে যোগদান করার সুযোগ পেয়েও যাননি। তবে তখনকার মুসলিম লীগের স্বৈরচারী শাসকের বিরুদ্ধে যে যুব সমাজ দাঁড়িয়েছিল তাঁদের অন্যতম হিসাবে বিশেষভাবে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পৃথক সত্ত্বা নিয়ে ফয়েজ আহমদ আত্মপ্রকাশ করেন। আওয়ামী লীগ গঠনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শেখ মুজিব কারাগারে ছিলেন। ফয়েজ আহমদের রাজনৈতিক জীবন প্রণালীতে ক্রমান্বয়ে শেখ মুজিব অঘোষিত ভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তিনি জানতেন, ফয়েজ আহমদ বাম দলের সাথে সম্পৃক্ত । কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদের দুজনের মধ্যে সম্পর্ক ছিল সুগভীর। ফয়েজ আহমদের ভাষায় - 'তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে আমি দুই রেল লাইনের মতো পাশাপাশি গিয়েছি , কোথাও ক্রস করিনি।' সাংবাদিকতা করার সময় থেকে তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটেরও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রামী ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক কারণেই ১৯৮২-৮৩ সালে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের জন্ম। তাঁর নেতৃত্বে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যেমন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার হয়েছিল তেমনি ১৯৮৮ সালের মহাপ্লাবন, ১৯৯০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সাধারণ মানুষের পাশে গিয়ে স্বতঃস্ফুর্তভাবে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়াও সেসময় তাঁর নেতৃত্বে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিরপেক্ষ সরকারের আমলে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার অভিযানে চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকূল থেকে রংপুর পর্যন্ত গণতন্ত্রের অভিযাত্রা আয়োজন করেছিল। নির্বাচনের পরপরই সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট অন্তর্র্বতীকালীন অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট বিচারপতি শাহবুদ্দিন আহমদের কাছে ১১ দফা সম্বলিত একটি সাংস্কৃতিক দাবীনামা পেশ করে। এই দাবীনামা পরে ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছেও উপস্থাপন করা হয়। প্রগতিশীল অসাম্প্রাদায়িক সংগঠন হিসাবে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট তাঁর কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এভাবে দ্রুত পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের কাছে। তের বছর দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করার পর তিনি জোট থেকে পদত্যাগ করেন। '৮০-র দশকে ফয়েজ আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর সিণ্ডিকেটের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি জাতীয় কবিতা উৎসবের প্রথম পাঁচ বছর আহ্বায়ক ছিলেন। এছাড়া ১৯৮২-তে বাংলা একাডেমীর কাউন্সিল সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু পরে এরশাদের সামরিক শাসনের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। ফয়েজ আহমদ সংসার করেননি। তাঁরা চার ভাই পঁচ বোন। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। ভাইদের কেউই বেঁচে নেই। তিনি ঢাকার প্রাচীন ও সুবৃহৎ আর্ট গ্যালারী 'শিল্পাঙ্গণ' এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯২ সালে। তিনি প্রগতিশীল পাঠাগার 'সমাজতান্ত্রিক আর্কাইভ' এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৯৬৬ সালে পিকিং রেডিওতে বাংলা ভাষার অনুষ্ঠান শুরু করার জন্যে তিনবছর মেয়াদে নিযুক্ত হন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম আর নেতৃত্বের ফলে অল্প সময়েই পিকিং রেডিওতে বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। সে সময় চীনে কালচারাল রেভ্যুলিউশন শুরু হয়। এছাড়া তিনি ঢাকা রেডিওতে ১৯৫২-৫৪ সালে 'সবুজ মেলা' নামের ছোটদের বিভাগটি পরিচালনা করতেন। মুক্তিযুদ্ধে ফয়েজ আহমদ এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। পাকিস্তানের প্রথম যুগে যেসব তরুণরা নানা ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তান শাসনের বিরুদ্ধে দেশের মানুষদের সংগঠিত করার জন্য কাজ করেছেন তিনি তাঁদেরই একজন। এজন্য তাঁকে দীর্ঘকাল আত্মগোপন করতে হয়েছে। তিনি যুব সম্মেলন এবং শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন। দেশে তাঁর নামে হুলিয়া বেরিয়েছে। মাওলানা ভাসানীর সাথে বিলেতে, কলকাতায় কাটিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসী সরকারে যোগ দেননি, কিন্তু প্রবাসী সরকারের সংবাদ সারাবিশ্বে প্রচারের জন্য সরকারের নেতারা তাঁর ওপর অনেকখানি নির্ভর করতেন। ঢাকা মুক্ত হবার সময় প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে ২২ ডিসেম্বর যে অগ্রবর্তী দলটিকে ঢাকায় পাঠানো হয় তিনি সেই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে তিনি প্রেসক্লাবে ছিলেন। ভোর রাতে ট্যাঙ্ক দিয়ে শত্রুবাহিনী প্রেস ক্লাবের দোতালায় তাঁর আশ্রয় কক্ষে গোলাবর্ষণ করে। তিনি বাঁ পায়ের উরুতে আঘাত পেয়ে মেঝেতে পড়ে থাকেন। পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে তিনি সচিবালয়ে আশ্রয় নেন এবং ২৭ মার্চ সকালে চিকিৎসার জন্য বেরিয়ে যান। কেবিনেটের অনুরোধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগদান করেন এবং সেখানে মনস্তাত্তিক যুদ্ধের উপর পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে শেষ দিন পর্যন্ত লিখেছেন। কর্মজীবন এবং রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তিনি প্রধানত শিশুকিশোরদের জন্য ছড়া ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর বইয়ের সংখ্যা প্রায় একশ। এর মধ্যে শিশুকিশোরদের জন্য বই রয়েছে ৬০টি। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী শিশুদের জন্য রচিত তাঁর চারটি বই ইংরেজীতে অনুবাদ করেছেন। এর মধ্যে কবীর চৌধুরীর ইংরেজীতে অনুদিত ১০০ টি ছড়ার একটি পুস্তক বাংলা একাডেমী ২০০৮ সালে প্রকাশ করেছে। তাঁর লেখা ছড়া নিয়ে একটি আবৃত্তি ও সঙ্গীতের ক্যাসেট বেরিয়েছে। ফয়েজ আহমদের বইগুলোর মধ্যে 'মধ্যরাতের অশ্বারোহী' সবচেয়ে বিখ্যাত। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ পুস্তক বলে বিবেচিত। ছড়ার বইয়ের মধ্যে-'হে কিশোর', 'কামরুল হাসানের চিত্রশালায়', 'গুচ্ছু ছড়া', 'রিমঝিম', 'বোঁ বোঁ কাট্টা', 'পুতলি' 'টুং', 'জোনাকী', 'জুড়ি নেই', 'ত্রিয়ং', 'তুলির সাথে লড়াই', 'টিউটিউ', 'একালের ছড়া', 'ছড়ায় ছড়ায় ২০০' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও তিনি চীনসহ বিভিন্ন দেশের পাঁচটি বই অনুবাদ করেছেন। এর মধ্যে হোচিমিনের 'জেলের কবিতা' উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য ফয়েজ আহমদ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বাংলা একাডেমী পুরস্কার, শিশু একাডেমী পুরস্কার, সাব্বির সাহিত্য পুরস্কার। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য ১৯৯১ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তাঁকে নুরুল কাদের শিশু সাহিত্য ও মোদাব্বের হোসেন আরা শিশু সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করা হয়। সাংবাদিক ফয়েজ আহ্মদের জীবন বিচিত্র অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। ১৯৪৮ সাল থেকে ৩৫ বছর তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। ফয়েজ আহ্মদ আশির দশকে গঠিত জাতীয় কবিতা উৎসবের প্রথম পাঁচ বছর আহ্বায়ক ছিলেন। সেই স্বপ্নমানুষ সাহসমানুষ ফয়েজ আহমদ চলে গেলেন। তাঁর এই চলে যাওয়ার কয়েকদিন আগেও গিয়েছিলাম তাঁর সাথে দেখা করতে। তিনি বলেছিলেন, ‘মেহেদী, যে যাই বলুক, যত ষড়যন্ত্রই করুক ভয় পেয়ে পিছে আসা নয়।’ সব সময় যে উৎসাহের পাল তুলে দিয়েছেন আমার প্রিয় মানুষেরা সেই উৎসাহমাঝিদের একজন তিনি। হারাতে হারাতে অ- নে-ক অভিভাবক হারিয়েছি আমি। হারিয়েছি দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান, মাহবুব উল আলম চৌধুরী, ভাষা সৈনিক গাজীউল হক, সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ওয়াহিদুল হক, কলিম শরাফি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আবদুর রাজ্জাক, কবি সমুদ্র গুপ্ত, সাংবাদিক পথিক সাহা, অভিনেতা গোলাম মোস্তফা, হুমায়ুন ফরীদিসহ অসংখ্য অভিভাবক। সেই হারানোর মিছিলে নতুন করে যোগ হলেন আমার অনন্ত সম্ভাবনার কথা বলা মানুষ কিংবদন্তির সাংবাদিক, সংগঠক ও ছড়াকার ফয়েজ আহমদ। তাঁকে হারিয়ে যখন চোখের জল নদী তৈরি করছে তখন খুব বলতে ইচ্ছে করছে ‘সাহসকাকা, এই দেখুন আমি আজন্মকালের জন্য সাহসী হয়ে উঠেছি। এই দেখুন লাল পতাকার রঙে রঙিন হয়ে আপনাকে জানাচ্ছি লাল সালাম। আপনি আমার সাথে থাকুন না ছায়া হয়ে, আপনার একটু উৎসাহকথা আমার সকল ভয় দূর করে দেবে। আপনার অসমাপ্তকাজ ( জামায়াত-যুদ্ধাপরাধী-শিবির, সা¤্রাজ্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণ) করার জন্য প্রতিনিয়ত প্রত্যয়ী পথ হাঁটতে চাই। কথা দিলাম কাকা, ভয় পেয়ে কখনোই পিছে আসবো না...’ যারা সম্মান করে তারা সম্মান পায়, আর যারা গুণিজনকে অসম্মান করে তারা চলে যায় ইতিহাসের আস্তাকুড়ে। এই কথাটি চিরন্তন সত্য। সবসময় সম্মান-শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার শিক্ষাদাতা ফয়েজ আহমদ-এর কাছ থেকে শিখেছি ভালো মানুষকে কিভাবে সম্মান করতে হয়। শিখেছি অন্যায়কারীকেও কিভাবে শায়েস্তা করতে হয়। আর তাই পরিশেষে ছড়াকার জগলুল হায়দার-এর ছড়ার মধ্য দিয়ে একটি কথাই তথাকথিত ছড়াকার আর দূর্নীতিবাজদের উদ্দ্যেশ্যে বলতে চাই, তা হলো-অনার করলে অনার পাবি/ ফাউল করলে ফাউল/ রুটি চাইলে আটা কিনবি/ ভাত চাইলে চাউল...

 

সম্পাদক,

banglareport24.com;

email: mominmahadi@gmail.com

 

WARNING: Any unauthorized use or reproduction of 'Community' content is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
 

[প্রথমপাতা]