|
|
তারেক -মিশুকসহ অন্যান্যদের চলে যাওয়া এবং এক দফা এক দাবী
মোমিন মেহেদী
চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ সাংবাদিক মিশুক মুনীর।
গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে অতিচেনা, খুবই উজ্জ্বল দুটি নাম। তারেক মাসুদ বাংলা
চলচ্চিত্রে নতুন ধারার সূচনা করে আপন মহীমায় উজ্জ্বল ছিলেন। \'মুক্তির গান\'
ও \'মাটির ময়না\' তাকে এনে দিয়েছিল খ্যাতি আর সম্মান। অন্যদিকে মিশুক মুনীর
একাধারে ছিলেন গণমাধ্যমকর্মী তরির অসামান্য কারিগর, তিনিও চিত্রগ্রাহক
হিসেবে আনত্দর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছিলেন। দু\'জনেই সুস্থ, প্রাণচঞ্চল,
কর্মক্ষম ছিলেন। ক'দিন আগেও তারা হাসিমুখে কথা বলেছেন স্বজন ও সহকর্মীদের
সঙ্গে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সড়ক দুর্ঘটনায় হঠাৎ মৃত্যু মেনে নিতে পারছিলেন
না কেউই। চলচ্চিত্রাঙ্গন, গণমাধ্যমকর্মীরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। সাধারণ
মানুষের মাঝেও ছিল হঠাৎ শূন্যতা। তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের আকস্মিক
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে
শোকের ছায়া নেমে আসে। তাদের দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন।
চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলামসহ গণমাধ্যমকর্মীরা ছুটে যান মানিকগঞ্জে।
ক্যাথেরিন মাসুদ, চিত্রশিল্পী ঢালী আল মামুনসহ চারজনকে স্কয়ার হাসপাতালে
ভর্তি করার পর সেখানেও ভিড় করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা, শিল্পী,
কলাকুশলীরা। এ সময় সেখানে যান রামেন্দু মজুদার, চাষী নজরম্নল ইসলাম, মানজারে
হাসিন মুরাদ, সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী, তানভীর মোকাম্মেল, শাহরিয়ার কবির, খুশী
কবীর, সৈয়দ ইকবাল, জয়নত্দ চট্টোপাধ্যায়, রোকেয়া প্রাচী, গোলাম কুদ্দুছ,
নাসির উদ্দীন ইউসুফ, হাসান আরিফ, মোসত্দফা সরয়ার ফারুকী, কায়সার আহমেদ,
শহীদুল আলম সাচ্চু, জয়া আহসান, নূরম্নল আলম আতিক, অমিতাভ রেজা, অনিমেষ আইচ,
এবং আমিসহ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই। সবার চোখে নোনাজল ছিল, ছিল
বেদনার বালুচর। অনেকেই ছিলেন বাকরম্নদ্ধ। তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কারো কোন
উপায় ছিল না। মানজারে হাসিন মুরাদ বলেন, \'তারেক মাসুদের মতো কীর্তিমানের
শূন্যস্থান কখনও পূরণ হয় না। তার অকাল প্রয়াণের শোক সইবার শক্তি আমাদের
কারও নেই।\' নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, \'তিনি ছিলেন একজন গুণী নির্মাতা।
তার এভাবে চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।\' তানভীর মোকাম্মেল বলেন,
\'তিনি ছিলেন আধুনিক ধারার চিত্রনির্মাতা। বাংলাদেশের চিত্রজগৎকে তিনি নিয়ে
গেছেন অনেক দূর। মুক্তির গানের মধ্য দিয়ে বিশ্বের কাছে মুক্তিযুদ্ধের
ইতিহাস নতুন করে তুলে ধরেছেন।\' তিনি আরও বলেন, \'তারেক ছিল আমার ৩০ বছরের
সহযোদ্ধা। মুক্তির গান থেকে শুরম্ন করে মাটির ময়না, অনত্দর্যাত্রা সর্বশেষ
রানওয়েসহ সব ছবি দেশ-বিদেশে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছে। এই মেধাবী
নির্মাতাকে হারানোর শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়।\' রোকেয়া প্রাচী বলেন,
তারেক ভাইয়ের চলে যাওয়ায় মনে হচ্ছে সব কিছুই যেন শেষ হয়ে গেছে। দেশে
অব্যাহত সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জয়নত্দ চট্টোপাধ্যায় বলেন, \'জীবন
হাতে নিয়ে চলি এখানে। কানো নিশ্চয়তা নেই। কেন আমাদের তারেক মাসুদকে হারাতে
হলো? এর জবাব কে দেবে?\' একই দৃশ্য কারওয়ানবাজারের এটিএন নিউজ কার্যালয়ে।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরই এটিএন নিউজের বার্তা কক্ষে আসেন মিশুক মুনীরের
দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং শুভানুধ্যয়ীরা। বার্তা কক্ষে অঝোর ধরায় কাঁদছিলেন
মিশুক মুনীরের সহকর্মী প্রণব সাহা, মুন্নী সাহাসহ আরো অনেকে। মুন্নী সাহা
বলেন, \'মিশুক মুনীর শুধু টেলিভিশন সাংবাদিকতার প্রাণপুরম্নষ ছিলেন না,
মানুষ হিসেবে অনেক বড় ছিলেন। কারিগরি দিকের চেয়ে সংবাদকর্মীর মেধা আর মনন
চর্চাকে শাণিত করতেই তিনি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতেন। তার মৃত্যুতে আমরা
অভিভাবক হারিয়েছি।\' গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের মধ্যে এখানে আসেন মনজুরম্নল
আহসান বুলবুল, সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, জ ই মামুন, রাহুল রাহা, আনিসুল হক, শাকিল
আহমেদসহ অনেকে। সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, \'মিশুক মুনীর আমার শিক্ষক ছিলেন,
পরে সহকর্মী ছিলেন। তার এভাবে মৃত্যু কিছুতেই মানতে পারছি না। এভাবে একটা
দেশ সড়ক দুর্ঘটনার কাছে জিম্মি থাকতে পারে না।\' বনানীর বাসভবনেও মিশুক
মুনীরের মা লিলি চৌধুরী, তার স্ত্রী মঞ্জলী কাজীসহ স্বজনদের আহাজারিতে
হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। রাত ৯টায় মিশুক মুনীরের মরদেহ নিয়ে আসা হয়
বনানীর বাসভবনে। এখানেও ছুটে আসেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, রামেন্দু মজুমদার,
চাষী নজরম্নল ইসলাম, আক্কু চৌধুরী, মিতা হক, আফরোজা বানুসহ অসংখ্য
গণমাধ্যম কর্মী। রাত সাড়ে ৯টায় চেয়ারম্যানবাড়ি জামে মসজিদে তার প্রথম জানাজা
অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে তারেক মাসুদ বেশিরভাগ সময় কাটাতেন সেই স্টুডিও ঘর,
শোবার ঘর, ড্রয়িং রম্নম পরিপাটি করে সাজানো। দেয়ালে ঝুলছে মাটির ময়নার
পোস্টার। সব কিছু আছে জায়গা মতো। নেই শুধু তারেক মাসুদ। চলে গেছেন না ফেরার
দেশে। আর কখনও ফিরবেন না তিনি। ছবিও বানাবেন না। ক্যামেরা ছুঁয়ে দেখবেন না।
পাশে স্ত্রীকে বসিয়ে নিজের তৈরি করা ছবি দেখবেন না। খাবার টেবিলে হেলান দিয়ে
রাখা তারেক মাসুদ ও ক্যাথেরিন মাসুদের যুগল ছবি। সেগুলো আজ স্মৃতি। ঘরের
প্রতিটি কোণে স্মৃতি জড়িয়ে আছে তারেক মাসুদের। দখিনা বারান্দায় চেয়ার রাখা
আছে। যেখানে বসে চা বা কফি খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়তেন আর প্রকৃতির সঙ্গে
মিশে যেতেন। খাবার রম্নমে বড় টিভি রাখা। সেখানে চলছে এটিএন নিউজ। তারেক
মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যুর সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। ওদিকে তারেক মাসুদের
স্টুডিও রম্নমে আপন মনে খেলা করছে তার শিশুপুত্র নিশাত মাসুদ। বয়স এক বছরের
কম। সে বুঝতেও পারছে না তার বাবা আর কখনও ফিরে আসবে না। কোলে নিয়ে চুমু খাবে
না। দুষ্টুমি করলে বকবে না। নাটকীয়তায় ভরা তারেক মাসুদের বর্ণাঢ্য জীবন
অকালেই ঝরে গেলো। ঝরে যাওয়া এই জীবনের গান শুরম্ন হয়েছিল স্বপ্নজ সময়ের হাত
ধরে। স্বল্প হলেও নাটকীয়তা ছিল তারেক মাসুদের জীবনজুড়ে। দেশের খ্যাতিমান এ
চলচ্চিত্র নির্মাতার লেখাপড়া শুরম্ন হয় মাদ্রাসায়। শৈশবের বড় একটি সময় তিনি
মাদ্রাসায় কাটান। তবে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সাধারণ শিক্ষা জগতে ফেরেন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময় থেকেই যুক্ত হন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের
সঙ্গে। পাশাপাশি দেশে-বিদেশে চলচ্চিত্রবিষয়ক অসংখ্য কর্মশালা এবং কোর্সে
অংশ নিতে থাকেন। এভাবে মূলত নিজেকে প্রস্তুত করেন তিনি। নির্মাণকাজ শুরম্ন
করেন ১৯৮২ সালে। তাঁর প্রথম প্রামাণ্যচিত্র \'আদম সুরত\'। প্রখ্যাত
চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানকে এ প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা
করেন তিনি। কিন্তু প্রথম কাজ হওয়ায় বিপত্তির শেষ ছিল না। নানা
প্রতিবন্ধকতার কারণে এর কাজ শেষ করতে ৭ বছর সময় ব্যয় হয়। \'আদম সুরত\' আলোর
মুখ দেখে ১৯৮৯ সালে। অবশ্য এরই মাঝখানে ১৯৮৫ সালে তিনি \'সোনার বেড়ি\' নামে
আরেকটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। এর পর ১৯৯৫ সালে নির্মাণ করেন \'মুক্তির
গান\'। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক
চলচ্চিত্র \'মুক্তির গান\' সে সময় দারম্নণ প্রশংসিত হয়। মার্কিন চলচ্চিত্র
নির্মাতা লিয়ার লেভিন ১৯৭১ সালে রণাঙ্গন ঘুরে যেসব ফুটেজ সংগ্রহ করেন সেগুলো
নিয়ে নির্মিত হয় \'মুক্তির গান\'। বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার
সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের দেশাত্মবোধক
ও সংগ্রামী গান শুনিয়ে উজ্জীবিত করতেন। শিল্পীদের সঙ্গে থেকে সে সময়টাকে
ক্যামেরাবন্দী করেন লেভিন। এভাবে প্রায় ২০ ঘণ্টার ফুটেজ সংগ্রহ করেন তিনি।
দীর্ঘ দুই দশক পর ১৯৯০ সালে তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদ নিউইয়র্কে লেভিনের সঙ্গে
দেখা করে সেই ফুটেজ সংগ্রহ করেন। একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য
তারা আরও বিভিন্ন উৎস থেকে মুক্তিযুদ্ধের নানা সংরক্ষিত উপাদান সংগ্রহ করেন।
এভাবে ১৯৯৫ সালে তৈরি হয় \'মুক্তির গান\'। এর এক বছর পর ১৯৯৬ সালে নির্মাণ
করেন \'মুক্তির কথা\'। ২০০২ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম পূর্ণদৈঘর্্য
চলচ্চিত্র মাটির ময়না। ছবিটিকে এ নির্মাতার মেধার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে
গণ্য করা হয়। তাঁর এ ছবি তবে শুধু দেশে নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রাঙ্গনে বাংলাদেশ
সমীহ আদায় করে নেয়। কান চলচ্চিত্র উৎসবের মতো বৃহৎ আসরে অত্যনত্ম সম্মানজনক
ক্রিট্রিক এ্যাওয়ার্ড জিতে নেয় ছবিটি। সে সময়ই সকলের মুখে মুখে রটে যেতে
থাকে এ চলচ্চিত্র নির্মাতার নাম। একই কারণে সেন্সর বোর্ড কতর্ৃক নিষিদ্ধ
ছবিটিকে বাংলাদেশ সরকার বাধ্য হয় মুক্তি দিতে। এ ছবির মাধ্যমে অত্যনত্ম
সাহসী এক নির্মাতাকে খুঁজে পান দর্শক। ধর্মীয় গোঁড়ামির নানা দিক তিনি
এমনভাবে তুলে ধরেন যা দেখে অভিভূত হন চলচ্চিত্রবোদ্ধারাও। ধর্মীয় গোঁড়ামির
কথা বলার সময় তিনি কোন ছাড় দেননি। আক্রমণাত্মক না হয়েও অত্যনত্ম সাবলীল
ভাষায় নিজের কথাটি তিনি বলে দিয়েছেন \'মাটির ময়না\' ছবিতে। নাইন
ইলেভেনপরবর্তী পরিস্থিতিতে \'মাটির ময়না\' আনত্মর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক
সমাদৃত হয়েছে এর বিষয়ের কারণে। তারেক মাসুদ ২০০৬ সালে নির্মাণ করেন \'অনত্মর্যাত্রা\'।
তাঁর সর্বশেষ নির্মিত ছবির নাম \'রানওয়ে\'। আনুষ্ঠানিক মুক্তি না দেয়া হলেও
এ ছবিটি নিয়ে সারাদেশ ভ্রমণ করছিলেন তারেক মাসুদ। উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়
২০১০-এর ২ অক্টোবর। ২০০৮-০৯ সালে চিত্রায়িত এই কাহিনীচিত্রটির পটভূমি হিসেবে
এসেছে ২০০৫-০৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে সংঘটিত কিছু ঘটনা। আনত্মর্জাতিক
বিমানবন্দরের রানওয়েসংলগ্ন একচালা ঘরে রুহুল ও তার পরিবার বসবাস করে। তার
মা রহিমা ্#২৫৪৪;ুদ্রঋণ সমিতির মাধ্যমে একটি গাভী কিনে দুধ বিক্রি করে
সংসার চালায়। রম্নহুলের বোন ফাতেমা গার্মেন্টসে কাজ করে। এক মাস হলো তার
বাবা মধ্যপ্রাচ্যে চাকরির সন্ধানে গিয়ে নিরম্নদ্দেশ। বেকার, কিছুটা হতাশ
অথচ আদর্শবাদী রম্নহুল চাকরি খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা করে এবং উড়োজাহাজের
ছায়ায় দিন কাটায়। মাঝে মধ্যে সে মামাকে সাইবার ক্যাফের ব্যবসায় সাহায্য করে
এবং ইন্টারনেট শেখার চেষ্টা করে। সেখানে দৃঢ় অথচ শানত্ম মেজাজের কম্পিউটার
দক্ষ আরিফের সঙ্গে তার ক্রমশ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। আরিফ উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির
মধ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে রম্নহুলকে উদ্বুদ্ধ করে। নতুন আদর্শে
উজ্জীবিত রম্নহুল বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অবশেষে জীবনের গভীরতর
অভিজ্ঞতা উপলব্ধির দিকে এগিয়ে যায় কেন্দ্রীয় চরিত্র। ছবিটি সম্পাদনা করেছেন
ক্যাথরিন মাসুদ। বাংলাদেশের বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সংগঠন
শর্টফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। ১৯৮৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম
আনত্মর্জাতিক স্বল্পদৈঘর্্য চলচ্চিত্র উৎসবের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ
করেছেন। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে
আনত্মর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেন। একই সড়ক দুর্ঘটনায় গুরম্নতর আহত তার
স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ মার্কিন নাগরিক। ক্যাথরিন এবং তারেক মিলে ঢাকায় একটি
চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন যার নাম অডিওভিশন। চলচ্চিত্র
নির্মাণ ছাড়া তারেক মাসুদের আগ্রহের বিষয় হচ্ছে লোকসঙ্গীত এবং লোকধারা।
তারেক মাসুদের অধিকাংশ ছবিতে এ ভাললাগার প্রকাশ পাওয়া যায়। তারেক মাসুদ চলে
গেলেন একেবারেই অকালে শুধুমাত্র সড়ক দূর্ঘটনার জন্য। সেই মর্মানত্দিক সড়ক
দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো আরেক মেধাবী আলো আশফাক মুনীর মিশুক ছিলেন দেশের
অত্যনত্দ খ্যাতিমান সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহক। নিজের কাজের মাধ্যমে শুধু দেশে
নয়, আনত্দর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর আরও একটি বড়
পরিচয় তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর বড় ছেলে। তিনি বাংলাদেশে
সমপ্রচার সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নেয়ার ৰেত্রে গুরম্নত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন।
এ টেলিভিশন ব্যক্তিত্বের কাছে হাতেখড়ি হয়েছে অনেক বড় বড় সাংবাদিকের। লম্বা
সময় ধওে নেপথ্যে থেকে টেলিভিশন সাংবাদিকতার উন্নয়নে কাজ করেছেন মিশুক মুনীর।
মিশুক মুনীর নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন তিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন
দেশে বিবিসির ভিডিওগ্রাহক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। বাংলাদেশের প্রথম
ব্যক্তি মালিকানাধীন টেরিস্ট্রেরিয়াল টেলিভিশন একুশে টিভিতে হেড অব নিউজ (অপারেশনস)
হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মিশুক মুনীর। দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। সর্বশেষ গত বছর তিনি এটিএন
নিউজে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। এ টিভি চ্যানেলটিকে
সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সকলের প্রিয় করে তুলতে দৃঢ় প্রত্যয়
ছিল তাঁর। এর আগে কানাডার রিয়েল টেলিভিশনের হেড অব ব্রডকাস্ট অপারেশন্স
হিসেবে দীর্ঘ আট বছর কাজ করেন তিনি। তিনি একই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বিশিষ্ট
চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তারেক মাসুদের \'রানওয়ে\'
ছবির প্রধান চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন মিশুক মুনীর। এ ছবিতে তাঁর কাজ
চলচ্চিত্রপ্রেমী সকল মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন। এছাড়া \'রিটার্ন টু
কান্দাহার\', \'ওয়ার্ডস অব ফ্রিডম\' প্রামাণ্যচিত্রগুলোতে কাজ করে ব্যাপক
প্রশংসা কুড়ান তিনি। সর্বশেষ তারেক মাসুদের নতুন চলচ্চিত্র \'কাগজের ফুল-এর
চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করার কথা ছিল তাঁর। এ জন্য লোকেশন দেখতে পরিচালকের
সঙ্গে মানিকগঞ্জ যান। সেখান থেকে ফেরার পথে চির না ফেরার দেশে পাড়ি জমান
মিশুক মুনীর। প্রিয় সহকমীর্র মরদেহ কাওরান বাজারের এটিএন নিউজ কার্যালয়ের
সামনে আনা হলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। টেলিভিশনটির
কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কান্নায় ভেঙ্গে পড়া
সময়জুড়ে আমাদের হোক এক দফা এক দাবী- 'নিরাপদ সড়ক চাই/ নরক নয়...'
email:
mominmahadi@gmail.com |
|