|
|
বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা...
মোমিন মেহেদী
'এমন দিনে তারে বলা যায়,/ এমন ঘনঘোর বরিষায়!/এমন
মেঘস্বরে বাদল-ঝরঝরে/ তপনহীন ঘন তমসায়৷/ সে কথা শুনিবে না কেহ আর,/ নিভৃত
নির্জন চারি ধার৷/ দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি,/ আকাশে জল ঝরে অনিবার৷/
জগতে কেহ যেন নাহি আর৷' এমন উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের মন জয় করছেন
শত বছর ধরে৷ তার সেই সাহসী-সৃজন বচন আমাদেরকে শুধু সাহসীই হতে শেখায় না,
শেখায় প্রার্থনায় মগ্ন হয়ে প্রভুর দয়া ভিৰা করাও৷ কবিগুরম্ন রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর মানেই মননে অত্র কবিতা-অবিনাশী গান৷ সেই সাহসী মানুষের সৃজনশীল
কর্মকান্ড মূলত শুরম্ন হয়েছিল তারম্নণ্যজয়ের স্বপ্ন থেকে৷ যে স্বপ্ন বপিত
হয়েছিল বিদেশ বিভূঁইয়ে৷ একটু লম্বা করে বলতে গেলে বলতে হয়, ১৮৭৯ সালের কথা৷
এই সালেই তিনি লন্ডনের ব্রাইটন স্কুল সানন্দে ভর্তি হয়েছিলেন৷ বৃটিশ
পার্লামেন্টে বক্তৃতা শোনার সুযোগ হয়েছিল তাঁর৷ এ বছরের পাঁচই নভেম্বর
রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'কবিকাহিনী' প্রকাশিত হয়৷ দীঘতর স্বপ্নের
প্রতিফলন ঘটে এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে৷ ১৮৮০ সালে তিনি স্বদেশে
ফিরলেন ব্যারিস্টারি ডিগ্রি অর্জন না করেই৷ ভঙ্গুর মন নিয়ে জাহাজে বসেই
লিখছিলেন 'ভগ্নহৃদয়' কবিতাটি৷ মাত্র বিশ বছর বয়সে ১৮৮১ সালে রবীন্দ্রনাথ 'বাল্মীকি
প্রতিভা' শীর্ষক নাটক রচনা করে তাতে বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয় করে সাড়া
জাগালেন৷ একুশ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথের 'সন্ধ্যাদদাত' কাব্যগ্রন্থের প্রশংসা
করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজের গলার মালাখানি রবীন্দ্রনাথের গলায়
পরিয়ে দিলেন৷ ১৮৮৩ সালে রবীন্দ্রনাথ প্রথম দার্জিলিং যান এবং কলকাতার ভাড়া
বাসায় ওঠেন৷ সেখানে 'ছবি ও গান' কাব্যগন্থের কবিতাগুলো রচনা করেন৷ ১৮৮৪ সালে
রবীন্দ্রনাথ প্রথম গদ্য নাটক 'নলিনী' রচনা করেন৷ এ বছরের ১৯ এপ্রিল কাদম্বরী
দেবী আকস্মিকভাবে আত্মহত্যা করেন৷ ১৮৮৬ সালে রবীন্দ্রনাথের 'বাল্মীকিপ্রতিভা'
নাটক মঞ্চাযিত হয় স্টার থিয়েটারে এবং সাধারণ রদালয়ে তিনি প্রথম অভিনয় করলেন৷
১৮৮৭ সালে তিনি বাল্যবিবাহের সমালোচনা করে জনসভায় প্রথম প্রবন্ধ পাঠ করেন৷
১৮৮৮ সালের এপ্রিল মাসে রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে গাজীপুরে যান৷ রবীন্দ্রনাথ ও
মৃণালিনী দেবীর এই প্রথম দৃঢ়ভাবে সংসারপর্ব শুরম্ন হলো৷ এখানেই তিনি নিষ্ফল
কামনার অনুবাদ কার্য সম্পন্ন করেন৷ রবীন্দ্রনাথের পুত্রসন্তান
রথীন্দ্রনাথের জন্ম হলো ২৭ নভেম্বর, ১৯৮৮৷ ১৮৮৯ সালে 'রাজা ও রানী' নাটকের
প্রথম খসড়া তৈরি করেন৷ ১৮৯১ সালের ৩০ মে কৃষ্ণকমল ভট্টাচাযের্র সম্পাদনায়
সাপ্তাহিক 'হিতবাদী' পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন
রবীন্দ্রনাথ৷ ১৮৯৩ সালে রবীন্দ্রনাথ 'ইংরেজ ও ভারতবাসী' শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ
করেন বঙ্কিমচন্দ্রের সভাপতিত্বে৷ তিনি হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের গুরুত্ব তুলে
ধরে লিখেছেন 'ইংরেজের আতঙ্ক' শীর্ষক উলেস্নখযোগ্য রচনা৷ ১৮৯৫ সালে
রবীন্দ্রনাথ প্রথম পাটের ব্যবসা শুরম্ন করেন৷ স্বরচিত 'টেগোর অ্যান্ড কোং'
নামাঙ্কিন কোম্পানির মাধ্যমে৷ সাঁইত্রিশ বছর বয়সে ১৮৯৭ সালে রবীন্দ্রনাথ 'কল্পনা'
কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা 'দুঃসময়' রচনা করেন৷ এ বছরই বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী
স্যার জগদীস চন্দ্র বসুর সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় ঘটে৷ ১৯০০ সালে
রবীন্দ্ররচনার প্রথম ইংরেজি অনুবাদ 'দি গড অফ দি উপনিষদম' প্রকাশিত হয়৷
১৯০১ সালের ১৫ জুন রবীন্দ্রনাথের প্রথমা কন্যা মাধুরীলতার বিয়ে হয় পনের বছর
বয়সে৷ ১৯০৪ সালে 'বঙ্গভাষার লেখক' শীর্ষক গ্রন্থের জন্য রবীন্দ্রনাথ প্রথম
আত্মজীবনী রচনা শুরু করেন৷ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ 'রাখীবন্ধন'
উত্সব প্রথম প্রচলন করেন৷ চিত্পুরের মুসলমান বস্তিতে সদলবলে গিয়ে
প্রত্যেককে রাখী পরালেন৷ রবীন্দ্রনাথ নাঘোদা মসজিদে গিয়ে মৌলভীদের হাতে
রাখী বেঁধে দিলেন৷ কলকাতার রাস্তায় মিছিলের সামনে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ৷ রচিত
হলো তার গান 'বাংলার মাটি বাংলার জল'৷ বন্ধুদের নিকট থেকে অর্থ ধার করে
পতিসরে প্রথম কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন কবি রবীন্দ্রনাথ৷ কৃষিবিদ্যা ও
সোপালন বিষয়ে শেখার জন্য তিনি পুত্র রথীন্দ্রনাথ এবং বন্ধুপুত্র
সন্তোষচন্দ্রকে আমেরিকায় প্রেরণ করেন ১৯০৬ সালের ৩ এপ্রিল৷ তিনি মেয়ে মীরার
জামাতাকেও কৃষি শিক্ষার জন্য আমেরিকা পাঠিয়েছিলেন৷ এ বছরই মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি
পেঁৗছে দিতে প্রথম বরিশাল আসেন৷ সেখান থেকে পরে চট্টগ্রামেও সফর করেন তিনি৷
১৯০৮ সালে তিনি দু'তিনটি গ্রাম নিয়ে 'আদর্শ পল্লী' গঠনের প্রচেষ্টা চালান৷
হীরালাল সেনের মামলায় সাক্ষ্য দিতে খুলনায় আসেন রবীন্দ্রনাথ৷ ১৯১০ সালের ২৭
জানুয়ারি পুত্র রথীন্দ্রনাথকে বিয়ে করান তিনি ১৮ বছর বয়সে৷ পাত্রী ছিলেন
গমেন্দ্রনাথের বোন বিনয়িনী দেবীর বিধবা কন্যা প্রতিমা৷ ঠাকুর পরিবারে এই
প্রথম বিধবা বিবাহ হলো৷ এ বিবাহের প্রস্তাবক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজেই৷ ১৯১০
সালের ১৫ আগস্ট প্রথম 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়৷ মাত্র ৯০ দিনে
তিনি ১৩৭টি গান ও কবিতা রচনা করেন৷ ভারতবর্ষে তিনিই প্রথম ৮০ বিঘা আদর্শ
কৃষিক্ষেতে প্রয়োগ করেন সার, পাম্পসেট, ট্রাক্টর৷ কৃষি গবেষণার জন্য তিনি
তৈরি করেন নতুন ধরনের লাঙল৷ এছাড়া আমেরিকা থেকে তিনি আনলেন অন্যান্য
যন্ত্রপাতি৷ ১৯১২ সালের ২৮ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ প্রথম ইংরেজিতে ভাষণ দিলেন
নিউইয়কের্র আরমান শহরে ইউনিটেরিয়ানদের সভায়৷ সেখানে তিনি দুটি ভাষণ
দিয়েছিলেন৷ ১৯১৭ সালে প্রমথ চৌধুরী সবুজপত্রে চলিত ভাষাকে সাহিত্যের
ভাষারূপে প্রচলিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালান৷ রবীন্দ্রনাথ উদ্যোগকে উত্সাহিত
করেন এবং স্বাগত জানান৷ তিনি চলিত ভাষায় 'পয়লা নম্বর' শীর্ষক রচনা করেন৷
১৯২১ সালের দোসরা ও তেসরা সেপ্টেম্বর জোড়াসাঁকোয় সাধারণ স্তরের মানুষের
জন্য রবীন্দ্রনাথের গানের প্রথম জলসা অনুষ্ঠিত হয়েছিল৷ এ সময়ই বিশ্বভারতীয়
উদ্বোধন হয়৷ ১৯২২ সালে কবির সমস্ত সৃষ্টি, সাহিত্য গান সব কিছুর কপিরাইট
দান কররেন বিশ্বভারতীয়কে৷ ১৯২৬ সালের সালের ৭-১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ঢাকায় এসে বক্তৃতা করেন৷ কলকাতায় ফিরেছেন তিনি
ময়মনসিংহ, আগরতলা, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ হয়ে৷ বৃটিশ সরকারের
দমননীতির বিরুদ্ধে তিনি খোলা চিঠি লিখেছেন ১৯২৭ সালে৷ রবীন্দ্রনাথের
সভাপতিত্বে জোড়াসাঁকোতে ১৯২৮ সালের ১৭-২০ মার্চ বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতা
সম্পর্কে নবীন ও প্রবীণ লেখকদের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়৷ ১৯২৯ সালে কলকাতার
আন্তর্জাতিক ধর্ম মহাসম্মেলনের উদ্বোধন করেন রবীন্দ্রনাথ৷ ১৯৩০ সালের ২৬
জুলাই রবীন্দ্রনাথের কাহিনী অবলম্বনে প্রথম বাংলা নির্বাক চলচ্চিত্র 'দালিয়া'
মুক্তি পায়৷ এ বছরের ২ মে রবীন্দ্রনাথের ১২৫টি ছবি নিয়ে প্রথম চিত্র
প্রদর্শনী হয় প্যারিসে৷ ১৯৩১ সালের ২৫ ডিসেম্বর থেকে সপ্তাহব্যাপী
রবীন্দ্রজয়নত্মী অনুষ্ঠিত হয় এবং ভারতে প্রথম রবীন্দ্রনাথের আঁকা চিত্র
প্রদর্শনী হয় কলকাতা টাউন হলে৷ রবীন্দ্রনাথের কাহিনী অবলম্বনে ১৯৩২ সালে
প্রথম সবাক চলচ্চিত্রে 'চিরকুমারসভা' মুক্তি লাভ করে৷ ১৯৩৩ সালে গান্ধীজীর
'হরিজন' পত্রিকার জন্য সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'মেথর' কবিতার ইংরেজি অনুবাদ
করেন রবীন্দ্রনাথ৷ তিনি অধ্যাপক বিজন ভট্টাচার্যকে নিয়ে বাংলা পরিভাষা
প্রণয়নের কাজ শুরু করেন৷ ১৯৩৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ প্রথম বাংলা ভাষায় ভাষণ দেন৷ এই প্রথম একজন
বেসরকারি ব্যক্তিত্ব উক্ত অনুষ্ঠানের সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেন৷ ১৯৩৮ সালের
১৬ মার্চ শান্তিনিকেতনে দোলপূর্ণিমার দিনে 'চন্দ্রালিকা'র প্রথম অভিনয়
অনুষ্ঠিত হয়৷ ১৯৪০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক রবীন্দ্রনাথকে 'ডিলিট'
উপাধি প্রদান করা হয়৷ উক্ত অনুষ্ঠানে স্যার মরিস গয়ার কর্তৃক ল্যাটিন ভাষায়
প্রদত্ত ভাষণের উত্তর দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংস্কৃত ভাষায় ভাষণদানের
মাধ্যমে৷ সভ্যতার সঙ্কট নিয়ে দুর্ভাবিত রবীন্দ্রনাথ ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট
শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন৷ মৃত্যু সবার জন্য অবধারিত৷ অবধারিত ছিল কবিগুরম্নর
জন্যেও৷ কিন্তু তিনি অমর হয়ে গেলেন কবিতা, গান আর অসংখ্য লেখনির মধ্য দিয়ে৷
চিরঞ্জিব রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ করেছিলেন 'বিপদে মোরে রৰা করো এ নহে মোর
প্রার্থনা৷' তার সেই প্রার্থনা আমাদেরও৷ আমরা যারা লড়ে যেতে চাই দেশের জন্য,
দেশের মানুষের জন্য তাদের প্রার্থনা শক্তি, শক্তি এবং শক্তি৷ কোন করম্ননা
বা দয়া আমাদের কাম্য হতে পারে না৷ একুশ শতকের এই সাহসী সময় জুড়ে
রবীন্দ্রনাথ ফিরে ফিরে আসছেন তার সৃজনও উচ্চারণের মধ্য দিয়ে৷ ঠিক এভাবে- '
আমারে ডেকো না আজি, এ নহে সময়/ একাকী রয়েছি হেথা গভীর বিজন,/ রম্নধিয়া
রেখেছি আমি অশানত্ম হৃদয়,/ দুরনত্ম হৃদয় মোর করিব শাসন।
email:
mominmahadi@gmail.com |
|