[প্রথমপাতা]

 

 

 

বিদ্যুৎ সমস্যায় ভর্তুকি: বিক্ষোভের অন্ধকারে সরকার

 

মোমিন মেহেদী

 

 

বর্তমানে উচ্চমূল্যে তেলভিত্তিক কুইক রেন্টালের কারণে প্রতিইউনিট বিদ্যুৎ উত্পাদনে ব্যয় হচ্ছে ৪ দশমিক ০৫৮ টাকা। পিডিবি প্রতিইউনিট বিক্রি করছে ২ দশমিক ৫৭ টাকা। দাম বাড়ালে ২০১৩ সাল নাগাদ এ দামে বিদ্যুত্ বিক্রি করতে হবে সরকারকে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বাড়বে অনেক বেশি। ২০১২ সালে হবে প্রতিইউনিট ৪ দশমিক ৯০৫ টাকা এবং ২০১৩ সালে হবে ৫ দশমিক ৪০৭ টাকা। এ কারণে ২০১১ সালে সরকারকে ৪ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা, ২০১২ সালে ৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা এবং ২০১৩ সালে ১০ হাজার ৪১০ কোটি টাকা ভুর্তকি দিতে হবে। এরপরে কত দিতে হবে তার চূড়ান্ত হিসাব এখনও পিডিবি করেনি। তবে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে আরো সতর্কতার সাথে। তা না হলে আর রক্ষা নেই। তাছাড়া বর্তমানে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর ভরসা করতে হবে। তুলনামূলকভাবে কম দামের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সহসা আসছে না। যার কারণে (বিদ্যুতের দাম না বাড়লে) ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত শুধু বিদ্যুতের জন্য সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে ২২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। গত বছর বিদ্যুত্ খাতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েও সরকার ঘোষণা করেছিল ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে লোডশেডিংমুক্ত করা হবে। কিন্তু তাও হচ্ছে না। গত ৮ আগস্ট এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী সমপ্রতি সাংবাদিকদেরকে বলেন, সরকার ২০১২ সাল নাগাদ স্বাভাবিক বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারবে। কিন্তু তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা আপাতত মেটানো সম্ভব নয়। রোজার আগে এবং শুরুর মুহূর্তে টানা ১০ দিনের গরমে দেশের বিদ্যুত্ ব্যবস্থা নাজুক হয়ে উঠেছিল। বিদ্যুতের দাবিতে অনেক এলাকায় ভাঙচুর এবং সড়ক অবরোধের মতো ঘটনা ঘটেছে। ঈদেও পরও এমন ঘটনা ঘটেছে চট্ট্রগ্রামের ফটিকছড়ি, মেহেরপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, বরিশাল, এমনকি রাজধানী ঢাকারও বিভিন্ন স্থানে। তবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় দাবি করেছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার ২২ মেগাওয়াট (১০ আগস্ট ২০১১ পর্যন্ত) জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে। বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয় এবং পিডিবি (বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে ১৪ হাজার ৭৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ৩৯টি চুক্তি, তুলনামূলক কম দামের বিদ্যুৎ কবে উৎপাদনে আসবে, সেই প্রত্যয়ের পথচেয়ে আছে বর্তমান। পিডিবি'র পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াটের ৪১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসানোর ৩৯টি চুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২০টির কম কেন্দ্র চালু হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ১৭ কেন্দ্র চালু হতে পারে। এর মধ্যে চারটি শুধু রেন্টাল। বাকিগুলো সরকারি খাতের বিদ্যুেকন্দ্র। এ কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন হবে ১৪শ ৫৯ মেগাওয়াট। এ ১৭টির মধ্যে ১৫টি কেন্দ্র উচ্চমূল্যের ফার্নেস অয়েল বা ডিজেল দিয়ে চলবে। এর মধ্যে এ মাসের মধ্যে চালু হবে পিডিবির ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, দাউদকান্দি, বাঘা, ফেঞ্চুগঞ্জ কেন্দ্র। এ কেন্দ্র থেকে উত্পাদন হবে ৩৭২ মেগাওয়াট। সেপ্টেম্বরেই রেন্টাল নোয়াপাড়া ১০৫ এবং কুইক রেন্টাল ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র চালু হতে পারে। আগামী মাসে পিকিং প্লান্ট দোহাজারী, হাটহাজারী এবং ভেড়ামারা কেন্দ্র চালু হলে গ্রিডে বিদ্যুত্ যাবে ২৭১ মেগাওয়াট। একই মাসে কুইক রেন্টাল কেরানীগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র চালু হচ্ছে। অক্টোবরে সিলেট এবং চাঁদপুর ছাড়াও কুইক রেন্টাল কাটাখালী কেন্দ্র চালু হবে। এ তিন কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ৪০৬ মেগাওয়াট। নভেম্বরে গাজীপুর এবং সিদ্ধিরগঞ্জ ২ নম্বর ইউনিট আরও ১৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াবে বলে সংবাদমাধ্যমকে পিডিবি জানিয়েছে। বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হলেও ২০১১ সালে বিদ্যুতের ঘাটতি থাকবে ৮২০ মেগাওয়াট এবং ২০১২ সালে বিদ্যুতের উদ্বৃত্ত থাকবে ৫৭ মেগাওয়াট। এর পরের বছর থেকে দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুত্ উত্পাদন হবে। এমনকি খাতা-কলমে দেখানো হয়েছে ২০১৬ সালে বিদ্যুতের উদ্বৃত্ত থাকবে ২ হাজার ১৪৯ মেগাওয়াট। ওই সময়ে সর্বোচ্চ চাহিদা হবে ১০ হাজার ২৮৩ মেগাওয়াট। কিন্তু উত্পাদন হবে ১২ হাজার ১৯৭ মেগাওয়াট। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সাংবাদিকদেরকে বলেছেন, গরমের তীব্র চাহিদা কবে মেটানো যাবে তা কেউ বলতে পারছেন না। সামিট এবং অরিয়নের বিদ্যুৎ কেন্দ্র কবে আসবে? তাও নিশ্চিত নয় আমাদের সরকার। অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপকে বর্তমান সরকার ১৮শ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুত্ বিক্রির অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক বিবিয়ানায় সাড়ে তিনশ মেগাওয়াটের দুটি কেন্দ্র এবং গ্যাস বা তেলভিত্তিক (দ্বৈত জ্বালানির) মেঘনাঘাটে আরও একটি সাড়ে তিনশ মেগাওয়াটের কেন্দ্র বসাবে সামিট গ্রুপ। গত মার্চে এ ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। ২০১৩ সালের মধ্যে এ কেন্দ্রগুলো উত্পাদনে আসার কথা। বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের কিছু কাজকর্ম সরকারকে হতাশ করছে। বিশেষ করে বিদ্যুেকন্দ্রের জমি বুঝিয়ে নেওয়ার পরও তারা নানা জায়গায় চিঠি দিচ্ছে। এমনকি এখন পর্যন্ত কোনো কেন্দ্রের জন্য কোনো এলসি করা হয়নি। তাই ঠিক সময়ে এ কেন্দ্রগুলো আসবে কিনা কেউ বলতে পারছে না। ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ুএ প্রতি ইউনিট বিদ্যুত্ ১২ টাকা এবং ডিজেল দিয়ে ২০ টাকার বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে সরকারকে। কিন্তু সরকারি বেসরকারি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় হচ্ছে গড়ে তিন টাকার কম। গ্যাসের চেয়ে একটু বেশি হলেও তুলনামূলক কয়লা দিয়ে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মুন্সীগঞ্জ এবং চট্টগ্রামে ২৫০ মেগাওয়াটের দুটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের টেন্ডার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে গত এপ্রিল মাসে। দেশীয় অরিয়ন গ্রুপ আমদানি করা কয়লা দিয়ে মাত্র ৩ টাকা ৭৫ পয়সায় সরকারকে বিক্রি করার দর দিয়েছে। সেই দর সবার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কয়লা কিনে ওই দামে কোনোভাবেই বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব নয় বলে পিডিবির বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এরপরও সেই প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে প্রায় তিন মাস আগে। সেই দুই কেন্দ্রের ব্যাপারে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি। এছাড়া ৪৫০ মেগাওয়াট করে বেসরকারি খাতে আরও দুটি কেন্দ্র বসানোর টেন্ডার প্রক্রিয়া এখনও চলছে। যদিও পিডিবি বলছে, তুলনামূলক কম দামের বেইস লোড (কয়লা এবং গ্যাস দিয়ে) উত্পাদনে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল নাগাদ ১০টি বড় কেন্দ্র বসতে পারে। যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে ৫ হাজার ৮৮০ মেগাওয়াট। তাই ২০১৬ সালের আগে বিদ্যুতে বড় ধরনের ভর্তুকি কমছে না। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর অঙ্গিকার, কিন্তু ইশতেহার ছেড়ে বহুদূরে এখন তারা। তাদেও মন্ত্রী-এমপি -আমলারা কেবলমাত্র নিজেদের আখের গোছতেই ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার কপালে ঝাড়ুর বাড়ি পড়তেও পারে সাধারন জনগন বিক্ষোভে নেমে গেলে। অতএব, সময় এখন সরকারের সাবধানতার; তা না হলে ঘনিয়ে আসবে আগামীতে জনগনের বিক্ষোভের অন্ধকার। সেই অন্ধকারে হারিয়েও যেতে পারে বর্তমান সরকারের অস্তিত্ব।

মোমিন মেহেদী : সম্পাদক, বাংলা রিপোর্ট২৪।

www.banglareport24.com;

email: mominmahadi@gmail.com
 

[প্রথমপাতা]

 

লেখকের সাম্প্রতিক লেখাঃ

 

>>কাদের-লিমনের অন্ধকার: র‌্যাব-পুলিশের আলো

>>তারেক -মিশুকসহ অন্যান্যদের চলে যাওয়া এবং এক দফা এক দাবী

>>বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা...

>>'১৫ আগস্ট ঘাতক ঘৃণাস্তম্ভ' নির্মাণের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

>>দূর্নীতির সুযোগে গড়ে উঠছে অনুমতিহীন স্কুল এন্ড কলেজ

>>আদিবাসী আলোয় হাসে স্বপ্ন

>>জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলীঃ
শেখ কামাল: বহুমূখী আলোর ইশারা

>>আওয়ামী পুলিশ: মানবাধিকার লংঘনে এগিয়ে