[প্রথমপাতা]

 

 

 

ছোটদল বড়কথা

 

মোমিন মেহেদী

 

ভোটের অংকে নেই তারা আছেন জোটের অংকে৷ শিরোনামটি দেখেই মনে পড়ে যায়, গত নির্বাচনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ৪৪টি, বিজেপি ৭টি, কল্যাণ পার্টি ৩৯টি, গণফোরাম ৪৪টি, গণতন্ত্রী পার্টি ৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতে জামানত হারায় এলডিপি ১৮টির মধ্যে ১৬টিতে, বিকল্পধারা ৬৩টির মধ্যে ৬১টিতে জামানত হারায়৷ পাশাপাশি কোন রকম লড়াই করার অনেক আগেই অসত্মিত্ব হারায় কিং পার্টিখ্যাত পিডিপি, এনপিপিসহ বেশ কিছু খুচরো সংগঠন৷ যাদের পূঁিজ বলতে আছে কেবলমাত্র প্রেস বিজ্ঞপ্তি আর রাজপথে ২৫ জনের মিছিল৷ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দীর্ঘ সময় বাকি থাকলেও ক্ষুদ্র নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে ক্ষমতাসীন মহাজোট এবং চারদলীয় জোটের টানা-হেঁচড়া শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে৷ এককথায় বলা যায়, এ নিয়ে চলছে ইঁদুর-বেড়াল খেলা৷ ক্ষুদ্র দলগুলোর নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক জোট সম্প্রসারণে বর্তমানে এক্কা-দোক্কা খেলা চলছে৷ এতে আসল সমস্যার সমাধান আসবে না৷ দেশবাসী নানা সংকট থেকে উত্তরণে বিকল্প পথ খুঁজছেন৷ ক্ষুদ্র দলগুলো বড় দলগুলোর জোটের অংকে থাকলেও ভোটের অংকে তাদের কোন অবস্থানই নেই৷ গত নির্বাচনী ফলাফল বিশেষণে দেখা গেছে, এসব ক্ষুদ্র দলের প্রাথর্ীদের ৯৯ শতাংশেরই জামানত খোয়া গেছে৷ জামানত খুইয়েছেন ক্ষুদ্র দলের বড় বড় নেতারাও৷ আগামী নির্বাচনে এর চেয়ে ভালো ফল আশা করছেন এসব দলের নেতা৷ সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনায় আছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম৷ তার বাসায় ধরনা দিয়েছেন মহাজোট এবং চার দলের নেতারা৷ তিনি শেষ পর্যনত্ম কোন পথে যাবেন তা নিয়ে সবার কৌতূহলও আছে বেশ৷ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় নির্বাচনে কাদের সিদ্দিকীসহ এ দলের ৪৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন৷ নির্বাচনী ফলাফলে এক অষ্টমাংশ ভোট না পাওয়ায় ৪৪ জন প্রাথর্ীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়৷ অর্থাত্‍ জামানত বাজেয়াপ্তি শতভাগ৷ টাঙ্গাইল ৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কাদের সিদ্দিকী মাত্র ১ হাজার ৮১ ভোট পান৷ যা ওই আসনে প্রদত্ত ভোটের শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ৷ সম্প্রতি চারদলীয় জোট এবং মহাজোট তাকে নিয়ে এভাবে টানা-হেঁচড়া করছে কেন? সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের উত্তরে কাদের সিদ্দিকী বলেন, বিষয়টা যারা দৌড়াদৌড়ি করছে তাদের জিজ্ঞেস করেন৷ গত নির্বাচনের ফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভালো আশা না থাকলে কেউ কি রাজনীতি করে! কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নিয়ে একটু খোলাশা করে বললে বলতে হয়, গত জাতীয় নির্বাচনে গামছা প্রতীক নিয়ে প্রদত্ত ভোটের শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট লাভ করে৷ সাম্প্রতিক সময়ে জোট-মহাজোটের দৌড়াদৌড়ির মধ্যমনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সভাপতি ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম৷ শেষ পর্যনত্ম তিনি কোন পথের পথিক হচ্ছেন তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সরগরম আলোচনা চলছে৷ গত নির্বাচনে এলডিপি ১৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে৷ এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১৩ চন্দনাইশ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কর্নেল অলি৷ চট্টগ্রাম-১৪ আসনে তিনি জামায়াতের প্রাথর্ীর কাছে বিপুল ভোটে হেরে যান৷ এ দুটি আসন ছাড়া বাকি ১৬টি আসনেই জামানত বাজেয়াপ্ত হয় এলডিপি প্রাথর্ীদের৷ এ দল ছাতা প্রতীক নিয়ে গত নির্বাচনে প্রদত্ত মোট ভোটের শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ লাভ করে৷ সাম্প্রতিক সময়ে সেই সংগঠনটিকে নিয়েও টানাহেঁচড়া চলছে৷ এ প্রসঙ্গে এলডিপির এক যুগ্ম মহাসচিব সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, দু'জোটই তাদের জোটের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে৷ পুরো দেশকে দ্বি-দলীয়করণের একটা চেষ্টা চলছে৷ এতে দেশের সমস্যার কোন সমাধান আসবে না৷ মানুষ বিকল্প রাসত্মা খুঁজছে৷ গত নির্বাচনে বাজে ফলাফল প্রসঙ্গে এ নেতা জানান 'কোটি কোটি টাকার খেলা বন্ধ হোক৷ দেখেন, এলডিপি এককভাবে কয়টি আসন পায়!' আশার আলো যেভাবে জ্বেলেছেন কাদের সিদ্দিকী, ঠিক সেভাবেই এগিয়ে যাচ্ছেন অলি আহমদসহ অসংখ্য নেতা৷ তবে জোট-মহাজোটের ছোট দল শিকার নাটকে বিকল্প ধারার নাম বেশ উপরেই আছে৷ আগামীতে কণ্টকাকীর্ণ চলার পথে জোট-মহাজোট দু'দলই সঙ্গ চায় বিকল্প ধারার৷ কিন্তু ভোটের অংকে এ দলের অবস্থাও তথৈবচ৷ গত জাতীয় নির্বাচনে ৬৩ জন প্রাথর্ী দেয় বিকল্প ধারা৷ এর মধ্যে জামানত বাজেয়াপ্ত হয় ৬১ প্রাথর্ীর৷ জামানত খোয়ানোর তালিকায় ছিলেন, বিকল্প ধারা সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দৌজা চৌধুরী, মহাসচিব আবদুল মান্নান (প্রতিদ্বন্দ্বিতাকৃত ২টি আসনেই)৷ কোন আসনেই এ দল জয়ের মুখ দেখেনি৷ কুলা প্রতীক নিয়ে গত নির্বাচনে এ দলের প্রাপ্তভোট শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ৷ শোনা যায়, এ নিয়ে মাহী বি চৌধুরীর সাথে অন্য নেতাদের মনোমালিণ্যও দেখা দিয়েছিল৷ কেউ কেউ বলছেন, বিকল্প ধারার পরাজয়ের কারনেই মাহী রাজনীতিতে নিরব হয়ে গিয়েছিলেন৷ আরেকটি ছোট দল-জাতীয় পার্টি জেপি৷ এই সংগঠনের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু৷ দলের চেয়ে দলের চেয়ারম্যানের পরিচিতিই বেশি৷ নানা বিড়ম্বনায় গত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শামিল হতে পারেননি মঞ্জু৷ তবু গত নির্বাচনে এ দলের প্রাথর্ী ছিলেন ৭ জন৷ ৭ জনই হারিয়েছেন জামানত৷ ৭ জনের মোট ভোট ৭ হাজার ৮১৮টি৷ যা প্রদত্ত ভোটের শূন্য দশমিক শূন্য এক শতাংশ৷ জোট-মহাজোটের ছোট দলগুলোর পেছনে ছোটা প্রসঙ্গে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, 'রাজনীতিতে এখন এক্কা-দোক্কা খেলা চলছে৷ গোলপোস্ট অভিন্ন রেখে সবাই স্থান পছন্দে ব্যস্ত৷ এক এক জোট এক এক কৌশলে এক এক লক্ষ্যে খেলছে৷ ক্ষুদ্র দলগুলোর ভোট প্রসঙ্গে মঞ্জু বলেন, চারদলীয় জোটে বিএনপি-জামায়াত ছাড়া কার কত ভোট আছে৷ মহাজোটে আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি ছাড়া কার কত ভোট আছে৷ ভোটের বিষয়টি বিবেচ্য নয়৷ বর্তমান খেলায় ভোটের অংকের চেয়ে জোটের সম্প্রসারণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷ জোট-মহাজোট বিস্তারের সাম্প্রতিক দৌড়ে এভাবেই আলোচনায় আছে অন্য ক্ষুদ্র দলগুলোও৷ ওয়ান ইলেভেনের সময় গজিয়ে ওঠা বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি গত নির্বাচনে ৩৯ আসনে প্রাথর্ী দিয়ে ৩৯টিতেই জামানত হারায়৷ এ দলের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনটিতেই জামানত হারান৷ এ দলটি হাতঘড়ি মার্কায় মোট ভোট পান ২১ হাজার ৬০৯টি৷ যা মোট ভোটের শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ৷ একইভাবে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনও ৩১টিতে প্রাথর্ী দিয়ে সবক'টিতে জামানত হারায়৷ এর মধ্যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনটিতেই জামানত হারান তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবল বশর মাইজভান্ডারি৷ গত নির্বাচনে জামানত হারানোর শীর্ষে আছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ৷ দলটি মরহুম চরমোনাই পীরের খয়নাতি প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরম্ন করেছিল৷ সেই ধারা এখনো অব্যহত আছে৷ জানা যায়, ১৬৭ আসনে প্রাথর্ী দিয়ে তারা পরাজিত হন সবক'টিতে৷ জামানত হারান ১৬৫ আসনে৷ ড. কামাল হোসেনের গণফোরামও ৪৪ আসনে প্রাথর্ী দিয়ে ৪৪টিতেই জামানত হারায়৷ গণতন্ত্রী পার্টি ৫ আসনের সবক'টিতেই জামানত খোয়ায়৷ ৫ প্রাথর্ী মোট ভোট পান ২ হাজার ৫৫০টি৷ যা মোট ভোটের শতাংশের হিসাবেই পড়ে না৷ একইভাবে গণফ্রন্ট ১৪ আসনে প্রাথর্ী দিয়ে ১৪টিতেই জামানত হারায়৷ জাকের পার্টি ৩৭ আসনে প্রাথর্ী দিয়ে মাত্র ১টি আসনে জামানত ফেরত পায়৷ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডি আসম আবদুর রবের কারণেই পরিচিত৷ জোট-মহাজোটের টানাপোড়েনে এ নেতার নামও আলোচিত৷ গত নির্বাচনে ৪৫ আসনে প্রাথর্ী দিয়ে একটি আসনে জামানত ফেরত পায় তারা৷ ন্যাশনাল পিপলস পার্টি ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবক'টিতে জামানত হারায়৷ এ দলের চেয়ারম্যান জামানত হারান বাগেরহাট-১ এবং ঢাকা-১০ আসনে৷ এ দলের প্রাপ্ত ভোট শূন্য দশমিক ১ শতাংশ৷ ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল ২১ আসনে প্রাথর্ী দিয়ে শতভাগ জামানত হারায়৷ ২১ আসনে প্রাপ্ত ভোট ১৪ হাজার ২২৮টি৷ এভাবে শতভাগ জামানত হারিয়েছে প্রশিকার কাজী ফারুক আহমদের গড়া দল ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন৷ বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, ফ্রিডম পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ এবং বাংলাদেশের বিপবী ওয়ার্কার্স পার্টি৷ জোট-মহাজোটের এ সম্প্রসারণ নাটকে এসব ক্ষুদ্র দলও বর্তমানে নড়াচড়া শুরু করেছে৷ বড় দলের কাঁধে চড়ে আগামী নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টাও করছেন অনেকে৷ ঐতিহ্যবাহী দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি গত নির্বাচনে ৩৭ আসনে প্রাথর্ী দিয়ে ৩৭টিতেই জামানত হারায়৷ জামানত হারিয়েছেন এ দলের সভাপতি মনজুরুল আহসান খান, কাজী আহাদ জহির চন্দন প্রমুখ নেতা৷ সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এ প্রসঙ্গে বলেন, বর্তমান মহাজোট এবং চারদলীয় জোট তাদের বলয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে৷ আসলে দু'জোটই দক্ষিণপন্থী৷ এ অবস্থায় কয়েকটি ফরমায়েশি দলও সক্রিয় হয়ে উঠেছে৷ এতে কাজের কাজ কিছুই হবে না বলে জানান তিনি৷ গত নির্বাচনে বাজে ফল প্রসঙ্গে সেলিম বলেন, 'আমাদের ভাই কোটি কোটি টাকা নেই৷ যেখানে কালো টাকার ছড়াছড়ি চলছে সেখানে মূল রাজনৈতিক দলগুলো তো ধাক্কা খাবেই৷ নির্বাচনের আড়াই বছর আগে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে আগামী নির্বাচনের আগে তা কোথায় গিয়ে শেষ হয় তা এখন অনুসরণ করতে পারছে না কেউই৷ তবে নির্বাচনের আগে এ মেরুকরণের ড্রামা, মেলোড্রামা যে আরও হবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই কারো৷ এই ড্রামার দর্শক হতে না চাইলেও জনগনকে হতেই হবে৷ কেননা, চারপাশে ষড়যন্ত্রের ঘ্রাণ৷ এই ঘ্রাণ-ই নিয়ে আসবে কষ্টের ভ্রমর৷ যা তৈরি করতে পারে আরেকটি ওয়ান ইলেভেন৷ যা আমাদের কারোই কাম্য নয়৷ কাম্য নয় তৃতীয় মাত্রার মত আলোকিত রাজনৈতিক প্রজন্ম৷

মোমিন মেহেদী : সম্পাদক, বাংলা রিপোর্ট২৪।

www.banglareport24.com;

email: mominmahadi@gmail.com
 

[প্রথমপাতা]

 

লেখকের সাম্প্রতিক লেখাঃ

 

>>রাজনীতির বাতিঘর ছাত্রলীগের রাতকাহন

>>প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন: জন্মদিন এবং প্রত্যাশা

>>কর্ণেল তাহেরকে নিয়ে তাহের দিবস

>>বাংলাদেশ কালোটাকা সাদা করার কারখানা

>>সাম্প্রতিক বর্ষার কথা-কবিতা এবং বর্ষামঙ্গল

>>হরতালের ময়নাতদন্ত এবং একটিমাত্র প্রস্তাব

>>মুসলমানমঙ্গল, পিতৃগণ এবং জাকির তালুকদার