প্রথমপাতা  

সাম্প্রতিক সংবাদ 

 স্বদেশ

আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশ কমিউনিটি

লাইফ স্টাইল

এক্সক্লুসিভ

বিনোদন

স্বাস্থ্য

বর্তমানের কথামালা

 শিল্প-সাহিত্য

 প্রবাসপঞ্জী 

আর্কাইভ

যোগাযোগ

 

 

 

 

 

 

টুঙ্গিপাড়ার খোকার আকাশ ছোঁওয়ার গল্প


আবদুল মান্নান
 

 

গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার অধিকাংশ স্থানীয় মানুষকে দেখেছি নামের আগে শেখ পদবিটা ব্যবহার করতে । কোনটি আসল শেখ আর কোনটি নয় তা নির্ণয় করা কঠিন । বছর খানেক আগে একবার কবি কাজী নজরুলের জন্মস্থান আসানসোলে গিয়েছিলাম । বেশীর ভাগ মুসলমান তাদের নামের আগে কাজী ব্যবহার করেন । সকলে দাবি করে তারা কবির আত্মীয় । এখানেও আসল নকল পৃথক করা কঠিন । আজমীরের খাজাবাবার দরগাহের আশেপাশে যারা থাকেন সকলে চিশতী । বলেন তারা খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির সরাসরি বংশধর । এখানেও বিভ্রান্তি । তবে টুঙ্গিপাড়ায় বিভ্রান্তি একটু কম কারণ সকলে আদি শেখ পরিবার অর্থাৎ শেখ লুৎফর রহমানের পরিবারের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে তেমনটা দাবি করেন না । শেখ লুৎফর রহমান জাতির জনক শেখ মুজিবের পিতার নাম । তাদের পূর্বপুরুষ শেখ আওয়াল প্রায় চারশত বছর আগে বেশ কিছু সঙ্গি নিয়ে মেসোপোটমিয়া (ইরাক) হতে চট্টগ্রাম হয়ে পূর্ব ভারতে প্রবেশ করেছিলেন । শেখ আওয়ালের জন্ম বর্তমান ইরাকের রাজধানী বাগদাদের হাসনাবাদ নামক স্থানে । শেখ আওয়াল অন্যান্য আরব সূফীদের মতো পূর্ব ভারতে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য এসেছিলেন বলে অনেকে মনে করেন । একই সাথে তারা এই দেশে তেজারতিও শুরু করেন । ধর্মপ্রচার ও তেজারতির উদ্দেশ্যে শেখ আওয়াল ও তার সাথে আসা সঙ্গি সাথীরা পূর্ব ভারতের বেশ কয়েক স্থানে ঘুরে শেষতক শেখ আওয়ালের পরবর্তি বংশধর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন । শেখ মুজিব ছিলেন শেখ আওয়ালের সপ্তম বংশধর । বাবা শেখ লুৎফর রহমান ও মা সায়েরা খাতুনের ঘরে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার মতো এক অজ পাড়া গাঁয়ে শেখ মুজিবের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ । বাবা মা আদর করে ডাকতেন খোকা বলে আর স্থানীয় বন্ধুবান্ধব সমবয়সী ও গ্রামের মানুষের কাছে মজিবর । স্কুলের খাতায় শুদ্ধ নাম শেখ মুজিবুর রহমান । রাজনীতিতে যখন স্থিতু হয়ে জশখ্যাতি হয়েছেন তখন শেখ মুজিব । বিদেশীদের কাছে মুজিব । ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ জন্ম নেওয়া খোকা আজ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব । আন্তর্জাতিক মহলে তিনি রাজনীতির কবি, চড়বঃ ড়ভ চড়ষরঃরপং নামে পরিচিত। বেঁচে থাকলে আজ তিনি ৯৭ বছরে পা রাখতেন । জীবিত অবস্থায় তিনি কখনো জন্মদিন পালন করেন নি, কোন কেক কাটা হয় নি, পারিবারিক ভাবেও না । অধিকাংশ জন্মদিন তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন । আর বাঙালি সমাজে ঘটা করে জন্ম দিন পালন করার রেওয়াজও তখন তেমন একটা ছিল না । তাঁর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ দিনটিকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালন করে আসছে । বঙ্গবন্ধু শিশুদের খুব আদর করতেন । তাঁর সন্তানরা শিশু হিসেবে পিতার আদর হতে বঞ্চিত হয়েছেন কারণ হয় তিনি রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে প্রায়শঃ পরিবারের বাইরে থাকতেন অথবা তাঁর জন্মদিনটা কারাগারের নির্জন প্রকৌষ্ঠে কাটতো । কিছুটা ভাগ্যবান ছিল পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেল, তাও স্বাধীনতার পর । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু যে সাড়ে তিন বছর বেঁচে ছিলেন তখন তিনি প্রায় সব সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাসেলকে সাথে নিয়ে যেতেন । সে দিক হতে রাসেল তার অন্য চার ভাই বোনের চাইতে কিছুটা ভাগ্যবান বটে । আজকের এই দিনে জনকের প্রতি রইলো সশ্রদ্ধ অভিবাদন ।
পিছনে ফিরে তাকালে মনে হয় বঙ্গবন্ধু সময়ের আগেই জন্মেছিলেন । যে সময়ে বঙ্গবন্ধুর জন্ম সে সময়ে বাঙালি মুসলমান সমাজ প্রকৃত অর্থেই একটি পশ্চাদপর জনগোষ্ঠী ছিল । তারা শিক্ষা দীক্ষায় ছিল পিছিয়ে । বেশীর ভাগ মানুষ হিন্দু জমিদারদের জমিতে বর্গা চাষী হিসেবে কাজ করতো । মুসলমানদের মধ্যে যারা একটু স্বচ্ছল পরিবারের ছিল তাদের বাড়ীতে বাঙালিয়ানার চর্চা তেমন একটা হতো না বললেই চলে । বাংলা ভাষাকে মনে করা হতো চাষাভুষার ভাষা । বঙ্গবন্ধুর পরিবার ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী । পূর্বপুরুষদের তেজারতির কারণে পরিবারের আর্থিক অবস্থা কিছুটা স্বচ্ছল ছিল । বলা চলে উচ্চ মধ্যবিত্ত । বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফর রহমান মাদারীপুর দেওয়ানী আদালতের সেরাস্তাদার ছিলেন । তাতে বুঝা যায় তিনি শিক্ষিত ছিলেন। শেখ মুজিবের শৈশব কেটেছে টুঙ্গিপাড়ায় । বাল্যকাল হতে মুজিব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করতেন না । গোপালগঞ্জে মুসলমানরা ছিলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় । তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতভেদ প্রথা বেশ শক্তভাবে গেঁড়ে বসেছিল । ১৯৩৭ সালে বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে দেখেন মুসলমান ছাত্রদের শ্রেণী কক্ষের পিছনের বেঞ্চে বসতে হতো । দীর্ঘ দিনের প্রথা ভেঙ্গে তিনি সামনের বেঞ্চে বসা শুরু করলেন । যেহেতু স্কুলের ফুটবল টিমে তিনি একজন নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন সেহেতু স্কুলের মাস্টার মশায়রা এই বিষয়ে তাঁকে আর কিছু বলেন নি । স্কুল জীবনে তিনি বেশ ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন । বাল্যকালে নানা ধরণের অসুস্থতার কারণে বালক শেখ মুজিব তাঁর সহপাঠিদের তুলনায় স্কুলে বেশ কয়েক বছর পিছিয়ে পরে ছিলেন।
বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে সকলে নেতা হতে চায় । কর্মী হয়ে দলের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে কেউ আর উপরে উঠতে চান না । আর যাদের বিত্ত আছে তারা অর্থ খরচ করে রাতারাতি নেতা হয়ে যান । বঙ্গবন্ধু এই সবের ব্যতিক্রম ছিলেন । তিনি কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজে গিয়ে ছাত্র রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পরেন। তাঁর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাসিম, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শরৎচন্দ্র বসু, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক । হক সাহেবের সাথে অনেক বিষয়ে তাঁর বনিবনা হতো না, তবে তিনি কখনো হক সাহেব সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোন কটূবাক্য ব্যবহার করেন নি কারণ তিনি জানতেন তাঁর পিতা ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের একজন ভক্ত । স্বল্প সময়ের জন্য তিনি নেতাজি সুভাষ বোসের সংস্পর্শেও এসেছিলেন । নেতাজির নির্দেশে হলওয়েল মনুমেন্ট ভাঙ্গার আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন । পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হলে যুবক মুজিব সেই আন্দোলনের সাথেও সম্পৃক্ত হয়ে পরেন । অনেকের মতো তাঁরও ধারণা ছিল মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র হলে হিন্দু জমিদার, মহাজন আর বেনিয়াদের শোষণ হতে মুসলমানরা রক্ষা পাবে । সেই বিশ্বাসে তিন মুসলীম লীগ নেতাদের সাথে ১৯৪৬ এর নির্বাচনের আগে বাঙলার গ্রামে গঞ্জে ঘুরেছেন । জিন্নাহ্র ডাইরেক্ট একশ্যান ডে’কে কেন্দ্র করে ১৯৪৬ সনে কোলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত হলে মুজিব একটি ভলান্টিয়ার বাহিনী গঠন করে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষা করার চেষ্টা করা সহ আহতদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ।
বঙ্গবন্ধু আজীবন রাজনীতি করেছেন । কিন্তু কখনো তিনি পদ পদবি বা ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হন নি । তাইতো তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে বলতে পেরেছিলেন ‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই’। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ট থাকার চাইতে দলের দায়িত্ব নেওয়াটাকে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন । তিনি বিশ্বাস করতেন দল আর সরকারের মধ্যে দলের গুরুত্ব অনেক বেশী কারণ সরকার ক্ষণস্থায়ী হতে পারে কিন্তু দল যদি মজবুত থাকে তাহলে হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও ক্ষমতায় যাওয়া যায় । ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের প্রাদেশিক মন্ত্রীসভায় শেখ মুজিব বাণিজ্য, শিল্প, শ্রম ও দূর্নীতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে মন্ত্রী ছিলেন । আওয়ামী লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হুকুম দিলেন দলের স্বার্থে আওয়ামী লীগ হতে নির্বাচিত মন্ত্রীরা হয় মন্ত্রী থাকবেন নয়তো দলের পদ পদবী হতে ইস্তফা দেবেন । নেতার নির্দেশে ১৯৫৭ সালের ৩১ মে শেখ মুজিব প্রাদেশিক মন্ত্রীর পদ হতে পদত্যাগ করে দলের দায়িত্ব নেন । কিন্তু অন্যান্যরা দল ছেড়েছেন কিন্তু মন্ত্রীত্ব ছাড়েন নি । ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ একুশ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে এবং নানা মুখী ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যে আবার সরকার গঠন করতে পারলো তা সম্ভব হয়েছে দলের ত্যাগী নেতদের কারনে যারা তাঁর পিতার আমলের মতো দলকে ধরে রাখতে পেরেছিলেন । কিন্তু দূঃখের সাথে বলতে হয় বর্তমানে দলে হাইব্রীড নেতাদের দাপটে প্রকৃত ত্যাগী নেতারা অনেকটা কোণঠাসা । এই সব কারণেই ইদানিং কালে যে কোন নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীর এত ছড়াছড়ি । সাবধান না হলে আগামীতে এই হাইব্রীডরা মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে ।
১৯৪৭ সনে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম হলে শেখ মুজিব সহ অন্যান্য যারা পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন তাদের মোহ ভঙ্গ হতে দেরি হয় নি যখন ১৯৪৮ সনের মার্চ মাসে পাকিস্তানের বড়লাট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকায় এসে ঘোষণা করেন পাকিস্তানের ছয় ভাগ মানুষের ভাষা উর্দুই হবে বাকি চুরানব্বই ভাগ মানুষের রাষ্ট্র ভাষা । এর অর্থ দাঁড়ালো এই চুরানব্বই ভাগ মানুষ রাতারাতি রাষ্ট্রীয় ভাবে মূর্খ হয়ে গেল কারণ উর্দু না জানার কারণে তাদের ভাগ্যে সরকারি কোন চাকুরি জুটবে না, তারা রাষ্ট্রীয় কোন কর্মকান্ডে জড়িত হতে পারবে না । জিন্নাহ্র এই ঘোষণার পর ঢাকায় যে ক’জন ছাত্র তার প্রতিবাদ করেছিলেন তাদের মধ্যে যুবক মুজিবও ছিলেন । মুজিব বুঝেছিলেন রাষ্ট্র বা সরকারের কোন অন্যায় কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কোন রকমের প্রতিবাদ করতে হলে চাই সংগঠন । তাঁর হাত ধরেই জন্ম হয়েছিল প্রকৃত অর্খে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল মুসলীম ছাত্র লীগ যা পরে ছাত্রলীগ হিসেবে পরিচয় লাভ করে । ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলীম লীগের জন্মের পিছনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিল অনবদ্য । আওয়ামী লীগের প্রথম কমিটির তিনি একজন যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন । টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া খোকা, বাঙালি জাতীর জনক শেখ মুজিব হয়তো কোন এক সময় আকাশ ছুঁতে ছেয়েছিলেন । তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মই হয়তো তাঁর সেই আশা পুরণ করেছিল ।
জনকের ৯৭তম জন্মদিনে ভূপেন হাজারিকার একটি অসাধারণ গানের কয়েকটি লাইন উদ্বৃত করে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই । ভূপেন হাজারিকা গেয়েছেন:
যদি হিমালয় আল্পস-এর সমস্ত জমাট বরফ
একদিন গলেও যায়, তবুও তুমি বাংলার
যদি গঙ্গা ভলগা হোয়াংহো নিজেদের
শুকিয়ে রাখে,
যদি ভিসুবিয়াস ফুজিয়ামা একদিন
জ্বলতে জ্বলতে জ্বলেও যায়
তবুও তুমি বাংলার ।
জয়তু মহানায়ক, বাংলার বন্ধু, জয়তু বঙ্গবন্ধু ।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক । মার্চ ১৬, ২০১৭

 

 

WARNING: Any unauthorized use or reproduction of 'Community' content is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action. 

 

[প্রথমপাতা]

 

 

 

লেখকের আগের লেখাঃ

 

 

 [......লেখক আর্কাইভ]